ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১০): বৈপরীত্যহীন এক কিতাব

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

মানুষ যত জ্ঞানীই হোক, তার লেখায় ভুল আর স্ববিরোধ থেকে যায়। বয়সের সাথে মত বদলায়, পরিস্থিতির সাথে চিন্তা বদলায়। তাই লেখকরা বইয়ের নতুন সংস্করণে আগের ভুল সংশোধন করেন। কুরআন এখানে এক অনন্য দাবি করেছে, এবং সেই দাবি যাচাই করার আহ্বানও জানিয়েছে।

কুরআনের দাবি

আল্লাহ তাআলা বলেন, "তারা কি কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে তারা এতে অনেক বৈপরীত্য পেত।" (সূরা নিসা ৪:৮২)

আরও বলেন, "আল্লাহ নাযিল করেছেন সর্বোত্তম বাণী, এমন এক কিতাব যার অংশগুলো পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ।" (সূরা যুমার ৩৯:২৩)

লক্ষ্য করুন, কুরআন অন্ধ বিশ্বাসের দিকে ডাকেনি। বরং বলেছে, চিন্তা করো, পরীক্ষা করো, খুঁজে দেখো।

কোন পরিস্থিতিতে নাযিল হয়েছে?

এই দাবির গুরুত্ব বুঝতে হলে দেখতে হবে, কুরআন কীভাবে নাযিল হয়েছে।

১. কুরআন একসাথে লেখা কোনো বই নয়। এটি তেইশ বছর ধরে অল্প অল্প করে নাযিল হয়েছে।

২. এর কিছু অংশ নাযিল হয়েছে মক্কায়, যখন মুসলমানরা নির্যাতিত ও দুর্বল। কিছু অংশ মদিনায়, যখন তারা একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করছেন।

৩. কিছু আয়াত এসেছে যুদ্ধের ময়দানে, কিছু শান্তির সময়ে। কিছু বিজয়ের আনন্দে, যেমন বদর ও মক্কা বিজয়। কিছু পরাজয়ের বেদনায়, যেমন উহুদ।

৪. নবীজির ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে গভীর শোক। প্রিয় স্ত্রী খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালিব একই বছরে ইন্তেকাল করেন। নিজের সন্তানদের একে একে হারিয়েছেন।

৫. আয়াতগুলো নাযিল হয়েছে ঘটনা অনুযায়ী, আর নবীজি (সা.) নির্দেশ দিতেন কোন আয়াত কোন সূরার কোথায় বসবে। নাযিলের ক্রম আর বিন্যাসের ক্রম ভিন্ন।

এমন পরিস্থিতিতে কোনো মানুষ যদি কিছু বলত, তবে তার কথায় পরিস্থিতির ছাপ পড়ত। দুর্বল অবস্থায় এক কথা, ক্ষমতায় এসে আরেক কথা। শোকের সময় হতাশা, বিজয়ের সময় অহংকার। অথচ কুরআনের আল্লাহ পরিচয়, তাওহিদ, আখেরাত, নৈতিকতা আর নবীদের বর্ণনা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একই সুরে বাঁধা।

নবীজির কথা আর কুরআনের কথা

আরেকটি বিস্ময়কর দিক হলো, নবীজির নিজের কথা (হাদিস) আর কুরআনের ভাষারীতি সম্পূর্ণ আলাদা। তেইশ বছর একই মানুষের মুখ দিয়ে দুই ধরনের বাণী বের হয়েছে, অথচ কখনো একটি অন্যটির সাথে মিশে যায়নি। কোনো মানুষ দীর্ঘ সময় ধরে দুটি পৃথক ভাষারীতি এত নিখুঁতভাবে আলাদা রাখতে পারে না।

এর চেয়েও বিস্ময়কর, কুরআন কখনো কখনো স্বয়ং নবীজিকে সংশোধন করেছে। যেমন এক অন্ধ সাহাবির প্রতি মনোযোগ না দেওয়ায় সূরা আবাসা নাযিল হয়। (সূরা আবাসা ৮০:১-১০) আরেক জায়গায় বলা হয়েছে, "আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন, আপনি কেন তাদের অনুমতি দিলেন?" (সূরা তাওবা ৯:৪৩) যদি নবীজি নিজে কুরআন রচনা করতেন, তবে কেন নিজের সমালোচনা নিজেই লিখে সবার সামনে পড়ে শোনাবেন, আর কেন তা চিরকালের জন্য সংরক্ষণ করবেন?

চৌদ্দশ বছরের যাচাই

কুরআনের এই দাবি কোনো গোপন বিষয় নয়। চৌদ্দশ বছর ধরে ইসলামের বিরোধীরা কুরআনের প্রতিটি শব্দ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েছে, বৈপরীত্য খোঁজার চেষ্টা করেছে। যা কিছু আপত্তি তোলা হয়েছে, মুসলিম আলেমগণ প্রতিটির জবাব দিয়েছেন, এবং দেখিয়েছেন যে, সেগুলো আসলে প্রেক্ষাপট না বোঝা, ভাষা না জানা বা অসম্পূর্ণ পাঠের ফল। "মুশকিলুল কুরআন" বিষয়ে লেখা অসংখ্য গ্রন্থ এর সাক্ষী।

একটি তুলনা

ভাবুন, কোনো মানুষ যদি তেইশ বছর ধরে ডায়েরি লেখে, যুদ্ধে-শান্তিতে, সুখে-দুঃখে, তবে শেষে সেই ডায়েরিতে কত মত বদলানো, কত পরস্পরবিরোধী কথা পাওয়া যাবে! অথচ কুরআন, যা জীবন, সমাজ, আইন, ইতিহাস, বিশ্বাস, নৈতিকতা, প্রকৃতি, আখেরাত সব বিষয়ে কথা বলেছে, তাতে এমন কোনো স্ববিরোধ নেই।

উপসংহার

তেইশ বছরের ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে, অসংখ্য বিষয়ে কথা বলা একটি গ্রন্থ যখন সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তখন বুঝতে হবে, এর বক্তা পরিস্থিতির অধীন কোনো মানুষ নন। তিনি সেই সত্তা, যাঁর জ্ঞান পরিপূর্ণ, যাঁর মত বদলায় না। তিনিই আল্লাহ, আর কুরআন তাঁরই বাণী।

আগামী পর্বে থাকছে একাদশ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।