ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১১): বাদশাহ ও ফেরাউন, কুরআনের নিখুঁত শব্দচয়ন

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

কুরআন ইতিহাসের বই নয়, তবে কুরআন যখন অতীতের ঘটনা বর্ণনা করে, তখন তার প্রতিটি শব্দ নিখুঁত। আজ আমরা এমন একটি ছোট্ট শব্দ দেখব, যা নিয়ে চৌদ্দশ বছর আগে কেউ প্রশ্নও তোলেনি, অথচ আধুনিক গবেষণা তার গভীর তাৎপর্য সামনে এনেছে।

মিশরের দুই শাসক, কুরআনের দুই শব্দ

কুরআনে মিশরের দুই যুগের দুই শাসকের কথা এসেছে।

১. হযরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগের শাসক। সূরা ইউসুফে তাঁর কথা বারবার এসেছে, প্রতিবারই তাঁকে বলা হয়েছে "আল-মালিক", অর্থাৎ বাদশাহ। যেমন, "বাদশাহ বললেন, আমি স্বপ্নে দেখেছি সাতটি মোটাতাজা গাভী..." (সূরা ইউসুফ ১২:৪৩) এবং "বাদশাহ বললেন, তাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।" (সূরা ইউসুফ ১২:৫০) পুরো সূরায় একবারও তাঁকে ফেরাউন বলা হয়নি।

২. হযরত মূসা (আ.)-এর যুগের শাসক। কুরআনে তাঁর কথা এসেছে সত্তরবারেরও বেশি, এবং প্রতিবারই তাঁকে বলা হয়েছে "ফিরআউন"। কোথাও তাঁকে "মালিক" বলা হয়নি।

পূর্ববর্তী গ্রন্থ কী বলে?

বাইবেলের আদিপুস্তকে (Genesis) ইউসুফ (আ.)-এর যুগের শাসককেও "ফেরাউন" (Pharaoh) বলা হয়েছে, আর মূসা (আ.)-এর যুগের শাসককেও। অর্থাৎ সেখানে দুই যুগের মধ্যে কোনো পার্থক্য করা হয়নি। কুরআন যদি পূর্ববর্তী গ্রন্থ থেকে কাহিনী নিত, তবে স্বাভাবিকভাবে এখানেও "ফেরাউন" শব্দই আসত।

ইতিহাস কী বলে?

"ফেরাউন" শব্দটি এসেছে প্রাচীন মিশরীয় শব্দ "পের-আ" থেকে, যার অর্থ "বড় ঘর", অর্থাৎ রাজপ্রাসাদ। মিশরতত্ত্ববিদদের মতে, দীর্ঘকাল পর্যন্ত এই শব্দটি প্রাসাদ বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, রাজাকে নয়। মিশরের "নতুন রাজ্য" (New Kingdom) যুগে, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতাব্দীর দিকে, শব্দটি রাজার জন্য ব্যবহার শুরু হয়।

অনেক গবেষকের মতে, হযরত ইউসুফ (আ.)-এর যুগ ছিল এর আগে, যখন শাসকের জন্য "ফেরাউন" উপাধি প্রচলিত ছিল না। আর হযরত মূসা (আ.)-এর যুগ ছিল পরে, যখন "ফেরাউন" রাজার পরিচিত উপাধি হয়ে গেছে। কুরআন ঠিক এই পার্থক্যই রক্ষা করেছে।

কীভাবে জানলেন?

এখানেই আসল প্রশ্ন। প্রাচীন মিশরীয় হায়ারোগ্লিফিক লিপি নবীজির যুগের বহু শতাব্দী আগেই বিস্মৃত হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবীতে কেউ তা পড়তে পারত না। ১৮২২ সালে ফরাসি গবেষক শ্যাম্পোলিয়ন রোজেটা পাথরের সাহায্যে এই লিপির পাঠোদ্ধার করেন। এরপরই মানুষ প্রাচীন মিশরের ইতিহাস, উপাধি আর শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শুরু করে।

তাহলে সপ্তম শতাব্দীর মক্কায়, যেখানে কোনো গ্রন্থাগার নেই, কোনো প্রত্নতত্ত্ব নেই, একজন উম্মী নবী কীভাবে জানলেন যে দুই যুগের শাসকের উপাধি ভিন্ন হওয়া উচিত? আর কেন তিনি তাঁর সমকালীন আহলে কিতাবের প্রচলিত বর্ণনা অনুসরণ না করে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করলেন?

ছোট শব্দ, বড় সাক্ষ্য

কেউ বলতে পারে, এটা তো একটি শব্দের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু ঠিক এখানেই প্রমাণের শক্তি। একজন মানুষ যখন বানিয়ে কাহিনী বলে, সে বড় বড় ঘটনা সাজাতে পারে, কিন্তু এমন সূক্ষ্ম ঐতিহাসিক খুঁটিনাটিতে সে ভুল করে বসে। কারণ সে এসব জানেই না, তাই তা নিয়ে ভাবেও না। কুরআনের এই নিখুঁত শব্দচয়ন দেখায়, এর বক্তা অতীতকে নিজের চোখে দেখার মতো করেই জানেন।

আল্লাহ তাআলা ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনীর শেষে বলেন, "এটা অদৃশ্যের সংবাদ, যা আমি আপনার প্রতি ওহি করছি। আপনি তো তাদের কাছে ছিলেন না।" (সূরা ইউসুফ ১২:১০২)

উপসংহার

যে কিতাব হাজার হাজার বছর আগের ইতিহাস বর্ণনা করতে গিয়ে এমন সূক্ষ্ম পার্থক্যও রক্ষা করে, যা মানুষ জেনেছে মাত্র দুইশ বছর আগে, সেই কিতাব কোনো মানুষের রচনা নয়। এটি সেই সত্তার বাণী, যাঁর কাছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই সমান স্পষ্ট।

আগামী পর্বে থাকছে দ্বাদশ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।