ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ২১): পাহাড়, পৃথিবীর পেরেক
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
পর্ব ২০-এ আমরা দেখেছি, প্রাণের মূল উপাদান পানি। আজ আমরা তাকাব পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল ও স্থির দৃশ্যমান বস্তুর দিকে, পাহাড়। আগের পর্বগুলোর মতো এখানেও আমাদের নীতি একই: আয়াতকে টেনে বিজ্ঞানের সাথে মেলাব না, আর বিজ্ঞানের নামে অতিরঞ্জিত দাবিও করব না।
পাহাড় একটি পেরেক
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি কি জমিনকে বিছানা বানাইনি? আর পাহাড়গুলোকে পেরেকস্বরূপ (আওতাদ)?" (সূরা নাবা ৭৮:৬-৭)
আরবি "ওয়াতাদ" (বহুবচন আওতাদ) বলা হয় সেই খুঁটি বা পেরেককে, যা দিয়ে তাঁবু মাটির সাথে বাঁধা হয়। আরবরা তাঁবুতে বাস করত, তাই এই শব্দের ছবি তাদের কাছে খুব পরিচিত ছিল। একটি তাঁবুর খুঁটির বৈশিষ্ট্য কী? এর একটি ছোট অংশ মাটির ওপরে দেখা যায়, আর বড় অংশ মাটির গভীরে পোঁতা থাকে। আর এর কাজ হলো তাঁবুকে স্থির রাখা।
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, "আর পাহাড়গুলোকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন (আরসাহা)।" (সূরা নাযিআত ৭৯:৩২) "আরসা" শব্দটি এসেছে "মুরসাত" থেকে, যার অর্থ নোঙর, যা জাহাজকে স্থির রাখে।
মানুষের চোখে পাহাড়
সপ্তম শতাব্দীর মানুষ, এমনকি তার পরের হাজার বছরের মানুষও পাহাড়কে দেখেছে মাটির ওপর উঁচু হয়ে থাকা বিশাল পাথরের স্তূপ হিসেবে। পাহাড়ের নিচে কী আছে, তা দেখার কোনো উপায় তাদের ছিল না। পাহাড় যে মাটির গভীরে কোনো "শিকড়" ছড়িয়ে রেখেছে, এমন ধারণা কারো ছিল না।
বিজ্ঞান যা আবিষ্কার করল
ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রিটিশ বিজ্ঞানীরা ভারতের হিমালয় অঞ্চলে জরিপ করতে গিয়ে একটি অদ্ভুত বিষয় লক্ষ করেন। এত বিশাল পাহাড়ের যে আকর্ষণ থাকার কথা, মাপজোখে তার চেয়ে কম পাওয়া যাচ্ছিল। এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ১৮৫৫ সালে ব্রিটিশ জ্যোতির্বিজ্ঞানী জর্জ এয়ারি প্রস্তাব করেন, পাহাড়ের নিচে মাটির গভীরে হালকা শিলার একটি বিশাল "শিকড়" আছে, যা নিচের ভারী স্তরের ভেতরে ঢুকে গেছে।
পরবর্তী গবেষণায় এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজ ভূতত্ত্ববিদরা জানেন, পৃথিবীর বড় বড় পর্বতমালার নিচে ভূত্বক স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি পুরু, আর পাহাড়ের এই শিকড় তার দৃশ্যমান উচ্চতার চেয়ে কয়েক গুণ গভীরে নেমে গেছে। যেমন হিমালয়ের নিচে ভূত্বক প্রায় ৭০ কিলোমিটার পর্যন্ত পুরু, যেখানে সাধারণ মহাদেশীয় ভূত্বক প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার। বিজ্ঞানীরা প্রায়ই এর তুলনা দেন বরফের পাহাড়ের সাথে, যার ছোট্ট একটি অংশ পানির ওপরে দেখা যায়, আর বিশাল অংশ থাকে নিচে।
এখন ভাবুন, পাহাড়ের এই আকৃতি বোঝাতে, যার ছোট অংশ ওপরে আর বড় অংশ মাটির গভীরে, তাঁবুর খুঁটির চেয়ে উপযুক্ত শব্দ আর কী হতে পারে?
ভারসাম্যের নিদর্শন
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, "তিনি জমিনে সুদৃঢ় পাহাড় স্থাপন করেছেন, যাতে তা তোমাদের নিয়ে হেলে না পড়ে (আন তামীদা বিকুম)।" (সূরা নাহল ১৬:১৫)
এখানে একটি বিষয়ে সৎ থাকা জরুরি। অনেক বয়ানে বলা হয়, "বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে পাহাড় ভূমিকম্প থামায়।" এই দাবি বিজ্ঞানসম্মত নয়। বরং পৃথিবীর বড় বড় পর্বতমালা প্রায়ই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাতেই অবস্থিত। তাই আমরা এমন দাবি করছি না।
আয়াতের "মাইদ" শব্দের অর্থ দুলে যাওয়া, হেলে পড়া, ভারসাম্য হারানো। ভূতত্ত্বে একটি প্রতিষ্ঠিত ধারণা আছে, যার নাম "আইসোস্ট্যাসি" বা ভূ-ভারসাম্য। এর মূল কথা হলো, পৃথিবীর ভূত্বক নিচের ঘন ও আধা-নমনীয় স্তরের ওপর এক ধরনের ভারসাম্যে ভেসে আছে, আর পাহাড়ের শিকড় এই ভারসাম্য বজায় রাখার অংশ। পাহাড় যত উঁচু, তার শিকড় তত গভীর, ঠিক যেন একটি দাঁড়িপাল্লা। আয়াতটি এই ভারসাম্যের দিকে ইঙ্গিত করে কি না, তা পাঠক নিজে বিবেচনা করবেন। তবে এটুকু নিশ্চিত, কুরআনের বর্ণনা ভূতত্ত্বের কোনো প্রতিষ্ঠিত তথ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয়।
পাহাড় আর মিষ্টি পানি
কুরআনের আরেকটি আয়াত পাহাড়ের এক উপকারী দিক তুলে ধরে, "আমি জমিনে স্থাপন করেছি সুউচ্চ সুদৃঢ় পাহাড়, আর তোমাদের পান করিয়েছি সুপেয় মিষ্টি পানি।" (সূরা মুরসালাত ৭৭:২৭)
এখানে পাহাড় আর মিষ্টি পানি এসেছে এক বাক্যে, পাশাপাশি। আজ আমরা জানি, পাহাড় আর্দ্র বাতাসকে ওপরে উঠতে বাধ্য করে, ফলে বাতাস ঠান্ডা হয়ে বৃষ্টি ঝরায়। পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফ ও হিমবাহ গলে নদী হয়ে নেমে আসে। পৃথিবীর বহু বড় নদীর উৎস পাহাড়ে, আর পৃথিবীর বিপুল সংখ্যক মানুষের সুপেয় পানির জোগান আসে পাহাড় থেকে। যেমন বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো, পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, এদের পানির বড় উৎস হিমালয়।
কেন এটি প্রমাণ?
কুরআন পাহাড়ের বর্ণনায় এমন একটি শব্দ বেছে নিয়েছে, যা সপ্তম শতাব্দীর তাঁবুবাসী আরবের কাছে ছিল সহজ ও পরিচিত, আবার ঊনবিংশ শতাব্দীর ভূতত্ত্বের আবিষ্কারের সাথেও আশ্চর্যভাবে মেলে। কুরআন বলতে পারত পাহাড় হলো "স্তূপ" বা "উঁচু ঢিবি", যেভাবে মানুষ পাহাড়কে দেখত। কিন্তু কুরআন বেছে নিয়েছে "পেরেক" আর "নোঙর", এমন দুটি শব্দ, যাদের মূল বৈশিষ্ট্যই হলো মাটির গভীরে প্রোথিত থাকা।
যিনি পাহাড় সৃষ্টি করেছেন, তিনিই জানেন মাটির নিচে এর কতটুকু লুকিয়ে আছে। একজন মানুষ যা চোখে দেখে, সে শুধু তারই বর্ণনা দিতে পারে।
উপসংহার
আল্লাহ তাআলা বলেন, "তারা কি দেখে না... পাহাড়ের দিকে, কীভাবে তা স্থাপন করা হয়েছে?" (সূরা গাশিয়াহ ৮৮:১৭-১৯) পাহাড়ের দিকে তাকালে আমরা দেখি তার উচ্চতা আর সৌন্দর্য। কিন্তু কুরআন আমাদের দৃষ্টি নিয়ে যায় তার গভীরে, যেখানে লুকিয়ে আছে স্রষ্টার নিখুঁত পরিকল্পনা। পাহাড় যেমন মাটির গভীরে প্রোথিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঈমানও তেমনি হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত হলে মানুষকে অবিচল রাখে।
আগের পর্ব (পর্ব ২০): পানি থেকে সকল প্রাণ
আগামী পর্বে থাকছে: দুই সাগরের মাঝে অদৃশ্য অন্তরাল। ইনশাআল্লাহ।




