ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৩): রোমানদের বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
কোনো মানুষ ভবিষ্যৎ জানে না। জ্যোতিষী, গণক কিংবা রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সবাই অনুমান করেন, আর বেশিরভাগ সময় ভুল করেন। কিন্তু কুরআন এমন সব ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যা নির্দিষ্ট, স্পষ্ট এবং সবার সামনে ঘোষিত। আর প্রতিটিই সত্য হয়েছে। এর একটি অনন্য উদাহরণ সূরা রূমের শুরুর আয়াতগুলো।
তৎকালীন বিশ্বের প্রেক্ষাপট
সপ্তম শতাব্দীর শুরুতে পৃথিবীর দুই পরাশক্তি ছিল রোম (বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য) আর পারস্য। দুই সাম্রাজ্যের মধ্যে চলছিল দীর্ঘ যুদ্ধ। ৬১৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে পারস্য রোমানদের একের পর এক শোচনীয় পরাজয় দেয়। তারা সিরিয়া দখল করে, জেরুজালেম জয় করে, পরে মিশরও কেড়ে নেয়। রোমান সাম্রাজ্য তখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রাজকোষ শূন্য, সেনাবাহিনী বিপর্যস্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় কেউ কল্পনাও করেনি রোম আবার মাথা তুলে দাঁড়াবে।
মক্কার মুশরিকরা এই খবরে আনন্দিত হয়েছিল। কারণ পারসিকরা ছিল অগ্নিপূজক, আর রোমানরা ছিল আহলে কিতাব। তারা মুসলমানদের বলত, তোমাদের মতো কিতাবওয়ালারা হেরে গেছে, তোমরাও আমাদের কাছে এভাবে হারবে।
কুরআনের ঘোষণা
ঠিক এই চরম হতাশার মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেন, "রোমানরা পরাজিত হয়েছে, নিকটবর্তী অঞ্চলে। আর তারা তাদের পরাজয়ের পর শীঘ্রই বিজয়ী হবে, কয়েক বছরের মধ্যেই। আগে ও পরের সকল বিষয় আল্লাহরই হাতে। আর সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে, আল্লাহর সাহায্যে।" (সূরা রূম ৩০:২-৫)
আয়াতে ব্যবহৃত শব্দ "বিদ'উ সিনীন", আরবিতে যার অর্থ তিন থেকে নয় বছরের মধ্যে। অর্থাৎ কুরআন শুধু বলেনি রোম জিতবে, বরং সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছে।
হযরত আবু বকর (রা.) এই আয়াতের ওপর এতটাই আস্থা রাখতেন যে, মক্কার এক মুশরিকের সাথে এ বিষয়ে বাজি ধরেছিলেন। তখনো জুয়া হারাম হয়নি। ঘটনাটি সুনানে তিরমিযিতে বর্ণিত হয়েছে।
ইতিহাস যা বলে
এরপর ঘটল অবিশ্বাস্য ঘটনা। রোমান সম্রাট হেরাক্লিয়াস নতুন করে সেনাবাহিনী গড়ে তুললেন। ৬২২ খ্রিস্টাব্দ থেকে তিনি পারস্যের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযান চালান এবং ৬২৭ খ্রিস্টাব্দে নিনেভের যুদ্ধে পারস্য বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেন। পারস্য সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ে, রোমানরা তাদের হারানো ভূখণ্ড ফিরে পায়।
আর আয়াতের শেষাংশ, "সেদিন মুমিনরা আনন্দিত হবে", সেটিও সত্য হয়েছে। মুফাসসিরগণ উল্লেখ করেছেন, রোমানদের বিজয়ের সংবাদ মুসলমানরা পেয়েছিলেন প্রায় সেই সময়ে, যখন তাঁরা বদর যুদ্ধে মুশরিকদের বিরুদ্ধে প্রথম বড় বিজয় লাভ করেন। একই সাথে দুই আনন্দ।
কেন এটি মানুষের কথা হতে পারে না?
একটু ভেবে দেখুন। যদি মুহাম্মদ (সা.) নিজে থেকে কিতাব রচনা করতেন, তবে তিনি কি এমন ঝুঁকি নিতেন? তাঁর শত্রুরা প্রতিটি সুযোগে তাঁকে মিথ্যাবাদী প্রমাণ করতে চাইছিল। যদি নয় বছরের মধ্যে রোম না জিতত, তবে পুরো কুরআনের বিশ্বাসযোগ্যতা ধসে পড়ত। একজন বুদ্ধিমান মানুষ কখনো তার সমস্ত দাবিকে এমন অনিশ্চিত রাজনৈতিক ঘটনার ওপর বাজি রাখে না। কিন্তু যিনি ভবিষ্যৎ জানেন, তাঁর কাছে এটি কোনো ঝুঁকিই নয়।
উপসংহার
যে সাম্রাজ্যকে সবাই মৃত ঘোষণা করেছিল, কুরআন তার পুনরুত্থানের সংবাদ দিল, সময়সীমা বেঁধে দিল, আর সেই সাথে মুমিনদের আনন্দের কথাও বলল। তিনটি বিষয়ই অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে। এই সংবাদ এসেছে তাঁর পক্ষ থেকে, যাঁর হাতে আগে ও পরের সকল বিষয়। তিনিই আল্লাহ, আর কুরআন তাঁরই বাণী।
আগামী পর্বে থাকছে চতুর্থ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।




