ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৪): আল-আমিনের সত্যবাদিতা

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

কেউ যখন কোনো বড় দাবি করে, আমরা প্রথমে দেখি, মানুষটা কেমন? সে কি সত্যবাদী, নাকি মিথ্যাবাদী? মুহাম্মদ (সা.) পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দাবিটি করেছিলেন: আমি আল্লাহর রাসূল। তাই তাঁর চরিত্র ও সত্যবাদিতা যাচাই করা এই দাবি বোঝার প্রথম ধাপ।

চল্লিশ বছরের সাক্ষ্য

নবুওয়াত পাওয়ার আগে নবীজি (সা.) মক্কায় চল্লিশ বছর কাটিয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি ব্যবসা করেছেন, মানুষের সাথে লেনদেন করেছেন, বিবাদ মিটিয়েছেন। কেউ কখনো তাঁকে মিথ্যা বলতে শোনেনি, কারো আমানত খেয়ানত করতে দেখেনি। তাই গোটা মক্কা তাঁকে উপাধি দিয়েছিল "আল-আমিন", পরম বিশ্বস্ত। এমনকি নবুওয়াতের পর যারা তাঁর ঘোর শত্রু হয়ে গিয়েছিল, তারাও নিজেদের মূল্যবান জিনিস তাঁর কাছেই আমানত রাখত। হিজরতের রাতেও তাঁর কাছে মক্কাবাসীর আমানত ছিল, যা ফেরত দেওয়ার জন্য তিনি হযরত আলী (রা.)-কে রেখে যান।

আল্লাহ তাআলা নবীজিকে এই বিষয়টিই মানুষের সামনে তুলে ধরতে বলেছেন, "আমি তো এর আগে তোমাদের মাঝে জীবনের দীর্ঘ সময় কাটিয়েছি, তবুও কি তোমরা বোঝো না?" (সূরা ইউনুস ১০:১৬)

সাফা পাহাড়ের ঘটনা

প্রকাশ্য দাওয়াতের শুরুতে নবীজি (সা.) সাফা পাহাড়ে উঠে কুরাইশের সব গোত্রকে ডাকলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, "যদি আমি বলি, এই পাহাড়ের ওপাশে একদল অশ্বারোহী বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের জন্য প্রস্তুত, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?" সবাই একবাক্যে বলল, "হ্যাঁ, আমরা কখনো আপনাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি।" তখন তিনি বললেন, "তাহলে শোনো, আমি তোমাদেরকে সামনের কঠিন শাস্তি সম্পর্কে সতর্ক করছি।" (সহিহ বুখারি)

লক্ষ্য করুন, যে মুহূর্তে তিনি নবুওয়াতের দাওয়াত দিলেন, তার ঠিক আগ মুহূর্তেও গোটা কুরাইশ তাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছে।

শত্রুর মুখে সাক্ষ্য

সবচেয়ে মূল্যবান সাক্ষ্য হলো শত্রুর সাক্ষ্য। হিজরতের পর যখন আবু সুফিয়ান নবীজির সবচেয়ে বড় শত্রুদের একজন, তখন রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াস তাঁকে দরবারে ডেকে নবীজি সম্পর্কে নানা প্রশ্ন করেন। একটি প্রশ্ন ছিল, "নবুওয়াতের দাবি করার আগে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ?" আবু সুফিয়ান স্বীকার করতে বাধ্য হলেন, "না।"

তখন হেরাক্লিয়াস বললেন, "আমি বুঝে গেছি, যে মানুষ মানুষের সাথে মিথ্যা বলে না, সে আল্লাহর নামে মিথ্যা বলবে, এটা হতে পারে না।" (সহিহ বুখারি)

এক অমুসলিম সম্রাটের এই যুক্তি আজও প্রতিটি চিন্তাশীল মানুষের জন্য প্রযোজ্য।

শত্রুরা আসলে কী অস্বীকার করত?

আল্লাহ তাআলা নবীজিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন, "তারা আসলে আপনাকে মিথ্যাবাদী বলে না, বরং জালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকেই অস্বীকার করে।" (সূরা আনআম ৬:৩৩)

অর্থাৎ মক্কার নেতারা জানত, মুহাম্মদ (সা.) মিথ্যা বলেন না। তাদের সমস্যা ছিল তাঁর আনা বাণী, যা তাদের মূর্তিপূজা, অহংকার আর ক্ষমতার ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।

যুক্তির দাবি

এখন ভাবুন, একজন মানুষ যিনি চল্লিশ বছর একটি মিথ্যাও বলেননি, তিনি হঠাৎ কেন সবচেয়ে বড় মিথ্যা বলবেন? সেটাও এমন মিথ্যা, যার জন্য তাঁকে সমাজচ্যুত হতে হবে, পাথর খেতে হবে, জন্মভূমি ছাড়তে হবে, প্রিয়জন হারাতে হবে? মিথ্যাবাদীরা মিথ্যা বলে সুবিধার জন্য। অথচ এই দাওয়াতে তিনি দুনিয়ার সবকিছু হারিয়েছেন, পাননি কিছুই।

উপসংহার

যাঁর সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছে তাঁর আপনজন, তাঁর জাতি, এমনকি তাঁর সবচেয়ে বড় শত্রু, তাঁর কথাকে অস্বীকার করার কোনো যুক্তি থাকে না। তিনি যখন বলেছেন, "আমি আল্লাহর রাসূল", তখনো তিনি সত্যই বলেছেন।

আগামী পর্বে থাকছে পঞ্চম প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।