ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৫): দুনিয়া চাননি যে নবী

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

ইতিহাসে বহু মানুষ নিজেকে নবী, অবতার বা ঈশ্বরের প্রতিনিধি দাবি করেছে। প্রায় সবার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা, সম্পদ, খ্যাতি বা ভোগ। তাই কোনো দাবিদারকে চেনার একটি সহজ পরীক্ষা হলো, তিনি এই দাবি থেকে দুনিয়ার কী পেয়েছেন? মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এই পরীক্ষায় এক অনন্য উত্তর দেয়।

উতবার প্রস্তাব

নবীজির দাওয়াত যখন মক্কায় ছড়িয়ে পড়ছিল, কুরাইশ নেতারা উতবা ইবনে রবিআকে তাঁর কাছে পাঠাল। উতবা বলল, "তুমি যদি সম্পদ চাও, আমরা তোমাকে এত সম্পদ দেব যে তুমি আমাদের সবচেয়ে ধনী হবে। যদি নেতৃত্ব চাও, আমরা তোমাকে আমাদের নেতা বানাব। যদি রাজত্ব চাও, তোমাকে আমাদের বাদশাহ বানাব।" শর্ত একটাই, এই দাওয়াত বন্ধ করতে হবে।

নবীজি (সা.) কোনো দর কষাকষি করেননি। তিনি জবাবে সূরা হা-মীম সাজদার শুরুর আয়াতগুলো তেলাওয়াত করলেন। উতবা ফিরে গিয়ে কুরাইশদের বলল, আমি এমন বাণী শুনেছি যা কবিতাও নয়, যাদুও নয়। তোমরা এই মানুষটিকে তার পথে ছেড়ে দাও। (সীরাতে ইবনে হিশাম)

চাঁদ-সূর্যের উপমা

সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে, কুরাইশরা যখন চাচা আবু তালিবের মাধ্যমে চাপ দিল, তখন নবীজি বললেন, "চাচা, আল্লাহর কসম! তারা যদি আমার ডান হাতে সূর্য আর বাম হাতে চাঁদ এনে দেয়, তবুও আমি এই কাজ ছাড়ব না, যতক্ষণ না আল্লাহ একে বিজয়ী করেন অথবা আমি এ পথে প্রাণ দিই।"

কুরআনে আল্লাহ তাআলা নবীজির মুখ দিয়ে ঘোষণা করিয়েছেন, "বলুন, আমি এর জন্য তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক চাই না। এটি তো সমগ্র বিশ্বের জন্য একটি উপদেশ মাত্র।" (সূরা আনআম ৬:৯০)

ক্ষমতা হাতে আসার পর

কেউ বলতে পারে, হয়তো তিনি বড় কিছু পাওয়ার আশায় ছোট প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাহলে দেখা যাক, যখন গোটা আরব উপদ্বীপ তাঁর অধীনে এল, তখন তিনি কেমন জীবন যাপন করেছেন।

হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, এক মাস, দুই মাস পেরিয়ে যেত, নবীজির ঘরে চুলায় আগুন জ্বলত না। আমাদের খাবার ছিল শুধু খেজুর আর পানি। (সহিহ বুখারি)

হযরত উমর (রা.) একদিন নবীজির ঘরে গিয়ে দেখলেন, তিনি খেজুর পাতার মাদুরে শুয়ে আছেন, আর তাঁর পবিত্র শরীরে মাদুরের দাগ বসে গেছে। ঘরে সামান্য কিছু যব আর একটি ঝুলন্ত চামড়া ছাড়া কিছু নেই। উমর (রা.) কেঁদে ফেললেন। বললেন, পারস্য ও রোমের রাজারা কত বিলাসে আছে, আর আপনি আল্লাহর রাসূল হয়ে এই অবস্থায়! নবীজি বললেন, "তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তাদের জন্য দুনিয়া আর আমাদের জন্য আখেরাত?" (সহিহ বুখারি)

এমনকি তাঁর ইন্তেকালের সময় তাঁর বর্মটি এক ইহুদির কাছে কিছু যবের বিনিময়ে বন্ধক রাখা ছিল। (সহিহ বুখারি)

উত্তরাধিকারেও কিছু রেখে যাননি

নবীজি (সা.) বলেছেন, "আমাদের (নবীদের) কোনো উত্তরাধিকার নেই, আমরা যা রেখে যাই তা সদকা।" (সহিহ বুখারি) অর্থাৎ নিজের পরিবারের জন্যও তিনি কোনো সম্পদ জমা করে যাননি। সাম্রাজ্য গড়া শাসকরা নিজের বংশের জন্য রাজত্ব রেখে যায়, কিন্তু তিনি রেখে গেছেন শুধু কুরআন আর সুন্নাহ।

যুক্তির দাবি

মিথ্যা বলার পেছনে সবসময় কোনো স্বার্থ থাকে। এখন প্রশ্ন হলো, নবুওয়াতের দাবি থেকে মুহাম্মদ (সা.) কী পেয়েছেন? সম্পদ নয়, তিনি অভাবে জীবন কাটিয়েছেন। আরাম নয়, তিনি মাদুরে ঘুমিয়েছেন। নিরাপত্তা নয়, তিনি নির্যাতিত হয়েছেন, যুদ্ধে আহত হয়েছেন। যে প্রস্তাব তাঁকে বিনা কষ্টে রাজা বানাত, সেটাও তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন। যিনি দুনিয়ার সব লোভনীয় জিনিস প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাঁর মিথ্যা বলার কোনো কারণই অবশিষ্ট থাকে না।

উপসংহার

নবীজির জীবন প্রমাণ করে, তিনি দুনিয়ার জন্য আসেননি। তিনি এসেছিলেন এক দায়িত্ব নিয়ে, যা আল্লাহ তাঁর ওপর অর্পণ করেছিলেন। আর এই নিঃস্বার্থ জীবনই সাক্ষ্য দেয়, তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল ছিলেন।

আগামী পর্বে থাকছে ষষ্ঠ প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।