ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৬): বিশুদ্ধ তাওহিদের বিশ্বাস

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

প্রতিটি ধর্মের কেন্দ্রে আছে একটি প্রশ্ন: স্রষ্টা কে, এবং তিনি কেমন? এই প্রশ্নের উত্তর যদি অস্পষ্ট, পরস্পরবিরোধী বা যুক্তির সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেই ধর্মের বাকি সবকিছুই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। ইসলাম এই প্রশ্নের যে উত্তর দেয়, তা যেমন সহজ, তেমনি গভীর এবং যুক্তির কষ্টিপাথরে সম্পূর্ণ খাঁটি।

চার আয়াতে স্রষ্টার পরিচয়

আল্লাহ তাআলা সূরা ইখলাসে নিজের পরিচয় দিয়েছেন, "বলুন, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। আর তাঁর সমতুল্য কেউ নেই।" (সূরা ইখলাস ১১২:১-৪)

মাত্র চারটি ছোট আয়াত। অথচ এতে স্রষ্টা সম্পর্কে মানুষের সব ভুল ধারণার জবাব রয়েছে। তিনি একাধিক নন। তিনি কারো ওপর নির্ভরশীল নন। তাঁর পিতা-মাতা, স্ত্রী বা সন্তান নেই। সৃষ্টির কেউ তাঁর মতো নয়।

যুক্তি বলে, স্রষ্টা একজনই

আল্লাহ তাআলা বলেন, "যদি আসমান ও জমিনে আল্লাহ ছাড়া আরও উপাস্য থাকত, তবে উভয়ই ধ্বংস হয়ে যেত।" (সূরা আম্বিয়া ২১:২২)

একটু ভাবুন। একটি দেশে দুজন প্রেসিডেন্ট, একটি জাহাজে দুজন ক্যাপ্টেন থাকলে বিশৃঙ্খলা অনিবার্য। যদি মহাবিশ্বের একাধিক স্রষ্টা থাকত, তবে তাদের ইচ্ছার সংঘাত হতো। একজন চাইত সূর্য পূর্বে উঠুক, আরেকজন চাইত পশ্চিমে। অথচ আমরা দেখি, মহাবিশ্বের প্রতিটি নিয়ম, পরমাণু থেকে ছায়াপথ পর্যন্ত, এক অভিন্ন ব্যবস্থায় চলছে। এই ঐক্যই সাক্ষ্য দেয়, এর পেছনে একজনই পরিচালক।

আরও বলেন, "আল্লাহ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি, এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো উপাস্যও নেই। থাকলে প্রত্যেক উপাস্য নিজ নিজ সৃষ্টি নিয়ে আলাদা হয়ে যেত এবং একে অপরের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করত।" (সূরা মুমিনুন ২৩:৯১)

স্রষ্টা সৃষ্টির মতো নন

অনেক ধর্মে স্রষ্টাকে মানুষের রূপে, পশুর আকৃতিতে বা মূর্তিতে কল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু যিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, তিনি যদি নিজেই সৃষ্টির মতো হন, তবে তিনি সৃষ্টির দুর্বলতাও বহন করবেন। ক্ষুধা, ক্লান্তি, মৃত্যু। এমন সত্তা স্রষ্টা হতে পারেন না।

ইসলাম স্পষ্ট বলে, "কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।" (সূরা শূরা ৪২:১১)

মাঝখানে কোনো দালাল নেই

ইসলামে মানুষ ও আল্লাহর মাঝে কোনো পুরোহিত, পীর, মূর্তি বা মধ্যস্থতাকারী নেই। যে কেউ, যেকোনো সময়, যেকোনো ভাষায় সরাসরি আল্লাহকে ডাকতে পারে।

আল্লাহ বলেন, "আমার বান্দারা যখন আপনাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে, তখন বলুন, আমি তো নিকটেই। আহ্বানকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।" (সূরা বাকারা ২:১৮৬)

এই বিশ্বাস মানুষকে অন্য মানুষের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেয়। রাজা হোক বা ফকির, সবাই একই আল্লাহর বান্দা, সবাই সরাসরি তাঁর দরবারে উপস্থিত হতে পারে।

মানুষের স্বভাবের ধর্ম

নবীজি (সা.) বলেছেন, "প্রতিটি শিশু ফিতরাতের (স্বভাবজাত সত্য ধর্মের) ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার পিতা-মাতা তাকে ইহুদি, খ্রিস্টান বা অগ্নিপূজক বানায়।" (সহিহ বুখারি)

তাই দেখা যায়, বিপদের চরম মুহূর্তে, যখন সব ভরসা শেষ হয়ে যায়, তখন নাস্তিকও হৃদয়ের গভীর থেকে এক অদৃশ্য শক্তিকে ডাকে। সে কোনো মূর্তি বা মধ্যস্থতাকারীকে ডাকে না, ডাকে এক মহান সত্তাকে। এটাই মানুষের ভেতরে গেঁথে দেওয়া তাওহিদের সাক্ষ্য। আল্লাহ বলেন, "এটাই আল্লাহর সেই ফিতরাত, যার ওপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা রূম ৩০:৩০)

সব নবীর একই বাণী

তাওহিদ ইসলামের নতুন আবিষ্কার নয়। হযরত নূহ, ইবরাহিম, মূসা, ঈসা (আ.), সব নবীই একই দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন, "আপনার পূর্বে আমি এমন কোনো রাসূল পাঠাইনি, যার প্রতি এই ওহি পাঠাইনি যে, আমি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, সুতরাং আমারই ইবাদত করো।" (সূরা আম্বিয়া ২১:২৫)

সময়ের পরিক্রমায় অন্য অনেক ধর্মে এই বিশুদ্ধ বিশ্বাসে নানা সংযোজন ঘটেছে। ইসলাম এসে সেই মূল, বিশুদ্ধ তাওহিদকে আবার প্রতিষ্ঠিত করেছে, এবং চৌদ্দশ বছর ধরে তা অবিকৃত রেখেছে।

উপসংহার

যে বিশ্বাস যুক্তির