ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ৮): নবীজির অনুপম চরিত্র

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

পর্ব ৪-এ আমরা নবীজির সত্যবাদিতা এবং পর্ব ৫-এ তাঁর দুনিয়াবিমুখতা দেখেছি। আজ দেখব তাঁর চরিত্রের আরও কিছু দিক: দয়া, ক্ষমা, বিনয় ও ন্যায়বিচার। আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাঁর চরিত্রের সাক্ষ্য দিয়েছেন, "নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের অধিকারী।" (সূরা কলম ৬৮:৪)

হযরত আয়েশা (রা.)-কে নবীজির চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, "তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন।" (সহিহ মুসলিম) অর্থাৎ কুরআনে যা আছে, তিনি ছিলেন তার জীবন্ত রূপ।

১. তায়েফের ক্ষমা

দাওয়াত নিয়ে নবীজি (সা.) তায়েফে গেলে সেখানকার লোকেরা তাঁকে অপমান করে তাড়িয়ে দেয়, পাথর ছুড়ে রক্তাক্ত করে। ফেরার পথে পাহাড়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতা এসে বললেন, আপনি চাইলে আমি দুই পাহাড় চাপিয়ে এদের ধ্বংস করে দিই। নবীজি বললেন, "না, বরং আমি আশা করি, আল্লাহ এদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ বের করবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

প্রতিশোধের পূর্ণ ক্ষমতা হাতে পেয়েও যিনি আঘাতকারীর কল্যাণ কামনা করেন, তাঁর হৃদয় কোনো সাধারণ মানুষের হৃদয় নয়।

২. মক্কা বিজয়ের দিন

যে মক্কার লোকেরা তেরো বছর তাঁকে নির্যাতন করেছে, সাহাবিদের হত্যা করেছে, তাঁকে জন্মভূমি থেকে বের করে দিয়েছে, আট বছর পর তিনি দশ হাজার সাহাবি নিয়ে বিজয়ী বেশে সেই মক্কায় প্রবেশ করলেন। সবাই ভয়ে কাঁপছে, আজ কী প্রতিশোধ নেওয়া হবে! নবীজি জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা আমার কাছে কেমন আচরণ আশা করো?" তারা বলল, আপনি সম্মানিত ভাই, সম্মানিত ভাইয়ের সন্তান। তিনি বললেন, "যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।" (সীরাতে ইবনে হিশাম)

ইতিহাসে কোন বিজয়ী সেনাপতি তার চরম শত্রুদের সাথে এমন আচরণ করেছে? এমনকি প্রিয় চাচা হামযা (রা.)-এর হত্যাকারী ওয়াহশিকেও তিনি ক্ষমা করেছেন।

৩. ঘরের মানুষের সাক্ষ্য

একজন মানুষের আসল চরিত্র জানে তার ঘরের লোক। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, নবীজি ঘরে পরিবারের কাজে সহযোগিতা করতেন, আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন। (সহিহ বুখারি) তিনি নিজের জুতা নিজে সেলাই করতেন, কাপড়ে তালি দিতেন।

হযরত আনাস (রা.) বলেন, "আমি দশ বছর নবীজির খেদমত করেছি। তিনি কখনো আমাকে 'উফ' পর্যন্ত বলেননি। কখনো বলেননি, এটা কেন করলে, বা এটা কেন করলে না।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)

একজন শিশু খাদেম, যে স্বাভাবিকভাবেই ভুল করবে, দশ বছরে তাকে একবারও ধমক না দেওয়া, এটা শুধু মহৎ চরিত্রেই সম্ভব।

৪. রূঢ় মানুষের প্রতি কোমলতা

একবার এক বেদুইন পেছন থেকে এসে নবীজির চাদর এত জোরে টান দিল যে তাঁর ঘাড়ে দাগ পড়ে গেল। তারপর বলল, আল্লাহর যে সম্পদ তোমার কাছে আছে, তা থেকে আমাকে দিতে বলো। নবীজি তার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, তারপর তাকে কিছু দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। (সহিহ বুখারি)

আরেকবার এক বেদুইন মসজিদে নববীতে প্রস্রাব করে দিল। সাহাবিরা রেগে তাকে থামাতে গেলেন। নবীজি বললেন, তাকে ছেড়ে দাও, শেষ করতে দাও। তারপর পানি ঢেলে জায়গা পরিষ্কার করালেন এবং লোকটিকে নম্রভাবে বুঝিয়ে দিলেন। (সহিহ বুখারি)

৫. ন্যায়ের প্রশ্নে আপস নেই

মাখযুম গোত্রের এক সম্ভ্রান্ত নারী চুরি করলে কুরাইশরা চাইল শাস্তি মাফ হোক। তারা নবীজির প্রিয়পাত্র উসামা (রা.)-কে সুপারিশের জন্য পাঠাল। নবীজি রেগে গেলেন এবং ভাষণ দিয়ে বললেন, তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছে এ কারণে যে, তাদের মধ্যে প্রভাবশালী কেউ চুরি করলে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল কেউ চুরি করলে শাস্তি দিত। "আল্লাহর কসম! যদি মুহাম্মদের মেয়ে ফাতিমাও চুরি করত, আমি তারও হাত কেটে দিতাম।" (সহিহ বুখারি)

৬. সব মানুষের প্রতি সম্মান

একবার একটি জানাজা নবীজির সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন। বলা হলো, এটা তো এক ইহুদির জানাজা। তিনি বললেন, "সে কি মানুষ নয়?" (সহিহ বুখারি)

কেন এটি প্রমাণ?

চরিত্রের অভিনয় কিছুদিন করা যায়, তেইশ বছর নয়। নবীজির জীবন ছিল খোলা বই। হাজার হাজার সাহাবি তাঁকে দেখেছেন যুদ্ধে ও শান্তিতে, সুখে ও দুঃখে, জনসমক্ষে ও ঘরের ভেতরে। তাঁর স্ত্রীরা তাঁর একান্ত জীবন জানতেন, শত্রুরা তাঁর প্রতিটি ভুল খুঁজত। অথচ সবার সাক্ষ্য একই: এমন মানুষ তারা আর দেখেনি। লক্ষণীয় যে, যাঁরা তাঁকে সবচেয়ে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁর স্ত্রী খাদিজা (রা.), তাঁর বন্ধু আবু বকর (রা.), তাঁর ঘরে বড় হওয়া আলী (রা.), তাঁরাই সবার আগে ঈমান এনেছেন।

একজন প্রতারক এমন চরিত্রের অধিকারী হতে পারে না, আর এমন চরিত্রের অধিকারী মানুষ প্রতারণা করতে পারেন না।

উপসংহার

আল্লাহ বলেন, "আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত হিসেবেই পাঠিয়েছি।" (সূরা আম্বিয়া ২১:১০৭) নবীজির দয়া, ক্ষমা, বিনয় আর ন্যায়বিচার এই আয়াতের জীবন্ত সাক্ষ্য। এমন পরিপূর্ণ চরিত্র আল্লাহর বিশেষ তত্ত্বাবধান ছাড়া গড়ে ওঠে না। তিনি সত্যিই আল্লাহর রাসূল।

আগামী পর্বে থাকছে নবম প্রমাণ, ইনশাআল্লাহ।