মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান কাসেমী
চীন থেকে এক ভাই ফোন দিলেন। তার স্ত্রীকে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে দিয়েছেন। রাগের মাথায় তালাক দিয়ে এখন পস্তাচ্ছেন। তার ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে আছে। স্বামী-স্ত্রী দুজনই আবার সংসারটা চালিয়ে যেতে চান।
ভাইটি তার পারিবারিক ও সাংসারিক সমস্যার বিস্তারিত অবস্থা আমার কাছে তুলে ধরলেন। চীনে বহু বছর ধরে আছেন। একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। বাসার কাছেই যে মসজিদ আছে, তার ইমাম একজন চাইনিজ মুসলিম। কোরিয়ার একজন ব্যবসায়ী ভাই তাকে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছেন।
আমি ব্যক্তিগতভাবে হানাফী মাযহাবের অনুসারী হলেও, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে মাযহাবের বাইরের কোনো মত গ্রহণের সুযোগও রয়েছে বলে মনে করি। তবে সেটি নিজের ইচ্ছামতো নয়। মাযহাবের বাইরের কোনো মতের পক্ষে মজবুত দলিল থাকলে, তা গ্রহণেরও কিছু উসুল ও শর্ত রয়েছে। আমি সেই উসুল অনুসরণ করেই প্রয়োজনের ক্ষেত্রে প্রশস্ততা গ্রহণ করি।
কিন্তু যেসব পুরুষ তাদের স্ত্রীকে এভাবে অসম্মান করেন, রাগের মাথায় তালাক দিয়ে দেন, তাদের প্রতি আমার কোনো সহানুভূতি জাগে না।
আমি তাকে বললাম, ‘রাগের মাথায় আপনার কলিজাটা কেটে ফেলতে পারলেন না? একটা পা তো কখনো রাগের বশে ভেঙে ফেলেন না। নিজের একটা চোখও উপড়ে ফেলেন না। তাহলে আপনার বউকে কেন রাগের শিকার বানাবেন?’
বেচারা তারপরও অনুরোধ করতে লাগলেন, ‘হুজুর, কোনো একটা পথ বের করে দিন।’
আমি বললাম, ‘আমার কাছে পথ এটাই, আপনি আপনার স্ত্রীর উপযুক্ত নন। তার কাছ থেকে আলাদা হয়ে যান।’
কোরিয়ার যে ব্যবসায়ী ভাইয়ের কথায় তিনি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, তাঁর দিকে তাকিয়ে আমি তাকে প্রফেসর মুখতার সাহেব ও ডক্টর মনজুরে ইলাহির নম্বর দিয়ে দিলাম। আহলে হাদীসের কিছু আলেম এ বিষয়ে ভিন্ন মত গ্রহণ করেন। মুখতার সাহেবের সঙ্গে আমার কথাও হলো। তিনি বললেন, “আচ্ছা, আমি তাঁর মাসআলাটা দেখব।’
তিন তালাকের মতো একটি সংবেদনশীল বিষয়ে ব্যক্তির পুরো ঘটনা, তালাকের ব্যবহৃত শব্দ, রাগের অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয় জেনে যোগ্য আলেমের কাছ থেকে ফতোয়া নেওয়া জরুরি। এ বিষয়ে ফিকহে বিস্তারিত আলোচনা ও মতপার্থক্য রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত আমার মনে হলো, এই ঘটনাটি শুধু একটি তালাকের ঘটনা নয়। এটি আমাদের অনেক পুরুষের জন্য একটি বড় শিক্ষা।
স্ত্রী আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার জন্য বড় একটি নিয়ামত। এই নিয়ামতের কদর করুন। তাঁকে সম্মান করুন। তাঁর সঙ্গে ভালো আচরণ করুন। আপনার দুনিয়া ও আখিরাতের অনেক কিছুই আপনার জীবনসঙ্গীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
রাগ কয়েক মুহূর্তের। কিন্তু সেই কয়েক মুহূর্তের সিদ্ধান্ত একটি পরিবারের সারাজীবন বদলে দিতে পারে।
তাই রাগের সময় একটু থামুন। নীরব থাকুন। স্থান পরিবর্তন করুন। অজু করুন। আল্লাহকে স্মরণ করুন। কিন্তু এমন কোনো কথা মুখ থেকে বের করবেন না, যার ভার আপনাকে সারাজীবন বহন করতে হতে পারে।
একটি পরিবার গড়ে তুলতে বছরের পর বছর লাগে। রাগের কয়েক মুহূর্তে সেটি ভেঙে ফেলবেন না।
লেখক: প্রবাসী আলেম স্কলার ও খতিব, আনসান মসজিদ অ্যান্ড ইসলামিক সেন্টার, দক্ষিণ কোরিয়া




