হিকিকোমোরি: ঘরের চার দেয়ালে বন্দী জাপানের লাখো মানুষ

জাপানের এক তরুণ। একসময় নিয়মিত স্কুলে যেতেন, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন। কিন্তু জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ছন্দপতন ঘটে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ করেন, বন্ধুদের ফোনের উত্তর দেওয়া কমিয়ে দেন। একসময় নিজের ঘরই হয়ে ওঠে তাঁর পুরো পৃথিবী। দিনের পর দিন কাটে কম্পিউটারের সামনে কিংবা বিছানায় শুয়ে। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও প্রয়োজন ছাড়া কথা বলেন না। বাইরে যাওয়ার কথা উঠলেই অস্বস্তি বোধ করেন। এভাবে মাস পেরিয়ে বছর চলে যায়।

এটি কেবল একজনের গল্প নয়। জাপানের বহু মানুষের জীবনে এমন পরিস্থিতি দেখা যায়। দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক জীবন থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখার এই প্রবণতা জাপানে পরিচিত ‘হিকিকোমোরি’ নামে।

হিকিকোমোরি বলতে সাধারণত এমন মানুষদের বোঝানো হয়, যাঁরা দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকেন। প্রচলিত সংজ্ঞা অনুযায়ী, ছয় মাস বা তার বেশি সময় ধরে এমন অবস্থা চলতে থাকাকে এর অন্যতম মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে হিকিকোমোরিতে থাকা সবাই যে একেবারেই ঘর থেকে বের হন না, তা নয়। কেউ প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দোকানে যান, কিন্তু অন্যদের সঙ্গে মেলামেশা এড়িয়ে চলেন। আবার কেউ নিজের ঘর থেকেই বের হতে চান না।

জাপান সরকারের ২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশটিতে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী প্রায় ১৪ লাখ ৬০ হাজার মানুষ হিকিকোমোরি অবস্থার মধ্যে ছিলেন বলে অনুমান করা হয়। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা জাপানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক চ্যালেঞ্জ।

হিকিকোমোরির পেছনে সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কারণ থাকে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, পারিবারিক পরিবেশ, সামাজিক চাপ ও মানসিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে।

স্কুলে সহপাঠীদের হাতে অপমানিত হওয়া, পরীক্ষায় ব্যর্থতা, পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়া, চাকরি হারানো কিংবা কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপের মতো অভিজ্ঞতা কাউকে ধীরে ধীরে সামাজিক জীবন থেকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে। পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিষণ্নতা ও সামাজিক উদ্বেগও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব অভিজ্ঞতার কোনোটিই এককভাবে হিকিকোমোরির কারণ, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

হিকিকোমোরিতে থাকা মানেই যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট কোনো মানসিক রোগে আক্রান্ত, তা-ও নয়। কারও ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যা থাকতে পারে, আবার কারও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার পেছনে অন্য ধরনের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক পরিস্থিতি কাজ করতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রে শুরুতে কেউ বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করা বন্ধ করেন কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে চান না। ধীরে ধীরে বাইরে যাওয়ার অভ্যাস কমে আসে। দীর্ঘদিন এভাবে থাকার পর মানুষের সঙ্গে আবার যোগাযোগ তৈরি করা, পড়াশোনায় ফেরা কিংবা চাকরি খোঁজা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

সামাজিক বিচার ও প্রত্যাখ্যানের ভয়ও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। দীর্ঘ বিরতির পর অন্যদের মুখোমুখি হলে কী বলবেন, এত দিন কোথায় ছিলেন, এমন প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। ফলে ঘরের মধ্যে থাকা সাময়িক স্বস্তি দিলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক জীবনে ফিরে আসার পথ আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

হিকিকোমোরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাপানে বিভিন্ন পরামর্শকেন্দ্র ও সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে। এসব উদ্যোগে ব্যক্তি ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরামর্শ দেওয়া, আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ধীরে ধীরে সামাজিক যোগাযোগ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে ফিরে যাওয়ার সহায়তাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

এ ক্ষেত্রে কাউকে জোর করে ঘরের বাইরে নিয়ে আসার পরিবর্তে তাঁর পরিস্থিতি ও সমস্যার কারণ বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। ধৈর্য ধরে পাশে থাকা এবং ব্যক্তির মানসিক প্রস্তুতির প্রতি সম্মান দেখানো সহায়তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

ঘরের মধ্যে দিনের পর দিন কাটানো মানুষটিকে বাইরে থেকে অলস বা অসামাজিক মনে হতে পারে। কিন্তু তাঁর ভেতরে কী ধরনের ভয়, উদ্বেগ কিংবা হতাশা কাজ করছে, তা না জেনে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।

হিকিকোমোরি থেকে বেরিয়ে আসার পথ সবার জন্য এক রকম নয়। কারও ক্ষেত্রে পরিবার ও বন্ধুদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, আবার কারও প্রয়োজন হতে পারে দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার সহায়তা।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মানুষদের দোষারোপ না করে তাঁদের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করা। কারণ, ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেই তার পেছনে থাকা মানুষটির জীবনে নতুন করে শুরু করার সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায় না।

সূত্র: জাপানের স্বাস্থ্য, শ্রম ও কল্যাণ মন্ত্রণালয়; Frontiers in Psychiatry।