সাজ্জাদ আকবর
এমফিল গবেষক, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগ, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো
(পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের দ্বিতীয় পর্ব। প্রথম পর্বে দেখানো হয়েছে, ঘটনার দুটি সম্ভাব্য চিত্রের কোনোটিতেই এই মৃত্যুদণ্ডের স্পষ্ট শরঈ ভিত্তি পাওয়া যায় না।)
২. এই মৃত্যুদণ্ডে কি মাকাসিদুশ শরিয়াহ লঙ্ঘন হয়েছে?
ইসলামি আইনের মূল উদ্দেশ্য বা 'মাকাসিদুশ শরিয়াহ' হলো পাঁচটি বিষয়কে হেফাজত রাখা— আল্লাহর দীন, মানুষের জীবন, বুদ্ধি, বংশ এবং সম্পদ। এর মধ্যে মানুষের জীবন রক্ষা (হিফজুন নাফস) মাকাসিদের জরুরিয়াত স্তরের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য। কুরআন বলছে— 'আল্লাহ যে প্রাণকে হারাম করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণ হত্যা করো না।' (সূরা আল-আন'আম, ৬:১৫১) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমের রক্ত হালাল হওয়ার তিনটি কারণ নির্দিষ্ট করেছেন: বিবাহিত ব্যক্তির ব্যভিচার, হত্যার বদলে হত্যা, এবং দীন ত্যাগ করে জামাআত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। মোটকথা, শরিয়াহর প্রতিটি শাস্তির পেছনে একটি উদ্দেশ্য আছে। তা'যিরের মূল উদ্দেশ্য সংশোধন ও প্রতিরোধ; অপরাধীকে মেরে ফেললে সংশোধন কার জন্য? এতক্ষণের আলোচনায় মনে প্রশ্ন জাগে— সৌদির এই মৃত্যুদণ্ড শরিয়াহর কোন উদ্দেশ্য পূরণ করল, আর কোনটি লঙ্ঘন করল?
প্রথমত: ফাসাদের মাত্রা কতটুকু? তা'যির হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায় তখনই, যখন অপরাধটি সমাজে ফাসাদ বা ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করে, যেমনটা একটু আগেই উল্লেখ করলাম। সৌদি আরব নিজেও তা'যিরে মৃত্যুদণ্ড দেয় তখন, যখন কেউ মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদের মতো অপরাধে সমাজকে ত্রাস, ক্ষয় আর ধ্বংসের রাজত্বে পরিণত করে। যেসব ক্ষেত্রে ক্ষতি ছড়িয়ে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে, বহু মানুষের জীবন পড়ে ঝুঁকিতে। এই মানদণ্ডে আলোচ্য ঘটনাটা একটু মিলিয়ে দেখা যাক— তারা কি কোনো সিরিয়াল রেপ করেছিল, রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিংবা গুপ্তচরবৃত্তি করেছিল, নাকি বারবার ইয়াবা-মদের চালান এনে সমাজকে করে তুলেছিল দুর্বিষহ? এই ঘটনায় কি জোরজবরদস্তি-সহিংসতা ছিল? কারও প্রাণহানি, সম্পদহানি বা জননিরাপত্তার হুমকি ছিল? বারবার অপরাধের রেকর্ড ছিল? এমন কোনো তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষ দিলে তো শুনতাম। তাদের অপরাধকে জাস্টিফাই করার সুযোগ নেই। অবশ্যই অপরাধ ছিল নিকৃষ্টতম, কিন্তু সেটা তো সীমিত ছিল ব্যক্তিগত পরিসরে এবং অহিংসরূপে। শরিয়াহর দৃষ্টিতে এটা চরম গর্হিত পাপ। এর ক্ষতি প্রথমত তাদের নিজেদের আখিরাতের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু এর সামাজিক ক্ষতি কোনোভাবেই রাষ্ট্র, সমাজ বা দীনের ভিত্তিমূল কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো মহামারী আকারের নৈরাজ্যকর ছিল না। এসবের চেয়েও বড় কথা হলো, তিন বছর তিন মাসের কারাবাসেই তা'যিরের উদ্দেশ্য অনেকটা অর্জিত হয়েছিল। তাহলে বাড়াবাড়ি করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় শরিয়তের কোন মাকসাদ অর্জিত হলো?
দ্বিতীয়ত: প্রকৃত ফাসাদ কার? কিছু সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত, কিন্তু এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই না হওয়া একটি দাবি অনুযায়ী, ঘটনাটি গোপনে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তৃতীয় একজন ব্যক্তি। দাবিটি সত্য হলে শরিয়াহর দৃষ্টিতে সেই ব্যক্তি একাধিক গুরুতর অপরাধ করেছে। যেমন, গোপনে ভিডিও ধারণ ও গোয়েন্দাবৃত্তি, যা সম্পূর্ণ হারাম। মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা প্রচার, যার জন্য কুরআন দুনিয়া ও আখিরাতে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির হুঁশিয়ারি দিয়েছে (আন-নূর: ১৯)। চার সাক্ষী ছাড়া অভিযোগ প্রচারের কারণে ওই ব্যক্তির ওপর হদ্দে কাযফের প্রশ্নও আসে (আন-নূর: ৪)। এসবের সাথে আছে সমাজে পাপের প্রচার, মানুষের সম্মানহানি। পবিত্র স্থানের মর্যাদা নিয়ে জনপরিসরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে মূলত ওই ব্যক্তির প্রচারের মাধ্যমেই।
তৃতীয়ত: পবিত্র হারাম শরীফের মর্যাদা লঙ্ঘন কতটুকু? পবিত্র হারামে এমন কাজ নিঃসন্দেহে অনেক বড় গুরুতর পাপ এবং পবিত্রতম মসজিদের মর্যাদার পরিপন্থী। কিন্তু ফিকহে প্রকাশ্যে, জনসমক্ষে ঘোষণা দিয়ে পাপ করা আর আড়ালে পাপ করার মধ্যে পার্থক্য আছে ঢের। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রকাশ্যে পাপকারী ছাড়া আমার উম্মতের সবাই ক্ষমাপ্রাপ্ত (বুখারি ও মুসলিম)। যদি কাজটি তারা লোকচক্ষুর আড়ালে করে থাকে, তাহলে মসজিদের মর্যাদা জনসমক্ষে ক্ষুণ্ন হয়েছে পরবর্তী প্রচারের মাধ্যমে— সংবাদমাধ্যমের অযাচাইকৃত তথ্য অনুযায়ী, যেটা তৃতীয় ব্যক্তি ভিডিও ধারণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে করেছে।
চতুর্থত: দীনের ভাবমূর্তি রক্ষা হয়েছে নাকি ক্ষুণ্ন হয়েছে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুনাফিকদের নেতা আবদুল্লাহ বিন উবাইকে হত্যার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, যাতে মানুষ না বলে যে মুহাম্মদ নিজ সঙ্গীদের হত্যা করেন (বুখারি)। এখান থেকে স্পষ্ট হয় যে, শরিয়াহর শাস্তি কার্যকরের পর সেটার সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিক্রিয়া কী হয়, সেটাও মাকাসিদুশ শরিয়াহর অংশ। অপ্রকাশিত রায়, তথ্য গোপন রেখে দণ্ডিতের পরিবার ও দেশকে অন্ধকারে রাখা আর হদের চেয়ে কঠোর শাস্তি মিলে আজ বিশ্বজুড়ে ইসলামি আইনকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হয়েছে। ফলাফল, এটি হিফজুদ দীন বা দীন রক্ষা নয়, বরং দীনের বদনামের কারণে পরিণত হলো।
পরবর্তী পর্বে: মক্কার ভেতরে অপরাধ: ইসলামি ঐতিহ্যে বিচারের যেসব নজির পাওয়া যায়




