সাজ্জাদ আকবর
এমফিল গবেষক, ধর্মতত্ত্ব ও দর্শন বিভাগ, আল-আজহার ইউনিভার্সিটি, কায়রো
(পাঁচ পর্বের ধারাবাহিক প্রবন্ধের চতুর্থ পর্ব। আগের পর্বে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, বিচারের তথ্য গোপন রাখা কি ইসলামি বিচারনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? এই পর্বে সেই আলোচনার বিস্তারিত।)
ক) দণ্ডিত ব্যক্তি ও পরিবারের অধিকার: রায় গোপন রাখা ও পরিবারকে না জানানো কি শরিয়াহসম্মত?
নজরুলের পরিবার তার মৃত্যুর খবর পেয়েছে সংবাদমাধ্যম থেকে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের মাত্র তিন দিন আগেও মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছিল নজরুলের। কিন্তু কী অপরাধে, কোন প্রমাণে, কোন যুক্তিতে ছেলের প্রাণ নেওয়া হলো, পরিবার আজও তা জানে না। মৃত্যুদণ্ড হবে, সেটাই তো জানত না। এমনকি এতদিন পরেও মরদেহ দেশে ফেরানো নিয়ে কোনো নির্দেশনা নেই।
ইসলামি শরিয়াহ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখে না; সে একজন মুসলিম, যার দুনিয়া ও আখিরাতের কিছু অধিকার মৃত্যু পর্যন্ত বহাল থাকে।
– অসিয়ত ও তাওবার প্রস্তুতি: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে মুসলিমের অসিয়ত করার মতো কিছু আছে, তার জন্য অসিয়ত লিখে না রেখে দুই রাতও কাটানো উচিত নয় (বুখারি)। যার মৃত্যুর দিন রাষ্ট্র নির্ধারণ করেছে, তার জন্য প্রস্তুতির এই সুযোগ আরও জরুরি।
– দণ্ডের আগে স্বজন ও সম্প্রদায়কে যুক্ত করা: মা'ইয রা. ব্যভিচারের স্বীকারোক্তি দিলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার গোত্রের লোকদের কাছে খোঁজ নিয়েছিলেন, তাঁর মানসিক অবস্থা স্বাভাবিক কিনা (মুসলিম)। অর্থাৎ নবীজি দণ্ডের আগে অভিযুক্তের পরিচিতজনদের যুক্ত করেছিলেন।
– জানাজা ও দাফনে পরিবারের হক: এক মুসলিমের ওপর আরেক মুসলিমের অধিকারের মধ্যে একটি হলো, সে মারা গেলে তার জানাজায় অংশ নেওয়া (মুসলিম)। ফকিহরা মৃতের গোসল, জানাজা ও দাফনে নিকটাত্মীয়দের অগ্রাধিকার নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পরিবারকে যখন মৃত্যুর খবরই জানানো হয়নি, সেখানে অন্যসব হকের কথা জিজ্ঞেস করতেও ইতস্তত বোধ হয়। খোদ নজরুল নিজেও আগে তার মৃত্যুর খবর পেয়েছিলেন কিনা, অসিয়ত বা সালাতের সুযোগ পেয়েছিলেন কিনা, তা আমরা জানি না। কিন্তু তার পরিবারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়েছিল, সেটি প্রতিষ্ঠিত তথ্য। শরিয়াহর উপরোক্ত মানদণ্ডে এটি ন্যায়বিচারের মানবিক দিকের স্পষ্ট ঘাটতি।
খ) বিচারের স্বচ্ছতা ও উম্মাহর সামনে জবাবদিহি
– প্রকাশ্য আদালত: ইসলামি ঐতিহ্যে বিচার গোপন কক্ষের বিষয় ছিল না। নবীযুগ থেকে কাজিরা সাধারণত মসজিদে বা প্রকাশ্য স্থানে বিচার বসাতেন, যে কেউ সেখানে উপস্থিত হতে পারত। তাছাড়া অপরাধ ও বিচারের তথ্য মানুষের সামনে না এলে তারা শিক্ষা নেবে কী করে? আর শিক্ষা ও সতর্কতা (যাজর) অর্জিত না হলে দণ্ডের মৌলিক উদ্দেশ্যই তো রইল না।
– লিখিত নথি: রায়ের লিখিত নথি সংরক্ষণ করা হতো এবং প্রয়োজনে পক্ষদের দেওয়া হতো।
– আত্মপক্ষ সমর্থন: আলী রা.-কে বিচারক করে পাঠানোর সময় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, দ্বিতীয় পক্ষের কথা না শুনে রায় দিও না (তিরমিযি)। মালিকি ফকিহরা এ থেকে 'ই'যার' নীতি প্রতিষ্ঠা করেছেন— রায়ের আগে বিচারক অভিযুক্তকে জিজ্ঞেস করবেন, তার পক্ষে আর কোনো যুক্তি বা প্রমাণ আছে কিনা।
– সন্দেহের সন্ধান: মা'ইয রা.-এর ক্ষেত্রে স্বীকারোক্তির পরও নবীজি বারবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, 'হয়তো তুমি শুধু চুম্বন করেছ, বা স্পর্শ করেছ বা তাকিয়েছ?' (বুখারি)। অর্থাৎ বিচারকের দায়িত্ব শুধু শাস্তির কারণ খুঁজে বের করা নয়, বরং শাস্তি এড়ানোর মতো সন্দেহ তালাশ করা।
– প্রকাশ্যে দণ্ড: কুরআন ব্যভিচারের হদ কার্যকরের সময় নির্দেশ দিয়েছে, 'মুমিনদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।' (সূরা আন-নূর, ২৪:২) শাস্তি যে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী হচ্ছে, তার সাক্ষী থাকাও এর উদ্দেশ্যের অংশ।
স্বীকার করতে হবে, বিচারকের পূর্ণ লিখিত যুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করে এমন সুস্পষ্ট নস নেই। কিন্তু প্রকাশ্য বিচার, আত্মপক্ষ সমর্থন, নথি সংরক্ষণ আর প্রকাশ্যে দণ্ড— শরিয়াহর এই পুরো কাঠামোর উদ্দেশ্য একটাই: বিচার যেন জবাবদিহির আওতায় থাকে। এখানে আমরা দেখছি তার বিপরীত চিত্র—
– প্রমাণ অজানা: কোন প্রমাণে দোষ সাব্যস্ত হলো— চার সাক্ষী, স্বীকারোক্তি নাকি অন্য কিছু— তা জানা গেল না। এক সাংবাদিকের যাচাইহীন দাবি অনুযায়ী প্রধান প্রমাণ ছিল গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও। দাবিটি সত্য হলে প্রশ্ন ওঠে, যে প্রমাণে এডিটিং কিংবা ডিপফেকের সম্ভাবনা থাকে, তা নিজেই সন্দেহ তৈরি করে। এমন প্রমাণের ভিত্তিতে কি সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া যায়?
– আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রশ্ন: নজরুলের মা জানিয়েছেন, ভাষার কারণে ছেলে প্রথম দিকে কাউকে কিছু বোঝাতে পারেনি। দোভাষী বা আইনজীবী ছিল কিনা, আমরা জানি না। জানার কোনো সুযোগও রাখা হয়নি। সমস্যা এখানেই।
– বন্দি-তালিকায় নীরবতা: দণ্ড কার্যকরের মাত্র দুই সপ্তাহ আগের বন্দি-তালিকাতেও এই দুজনের সাজার ঘর ছিল ফাঁকা।
এমন গোপনীয়তায় আলেম, গবেষক ও সাধারণ মুসলমান কেউই যাচাই করতে পারেন না যে আল্লাহর বিধান যথাযথভাবে প্রয়োগ হয়েছে কিনা।
পরবর্তী ও শেষ পর্বে: ওয়ালিউল আমরের ক্ষমতার সীমা ও উপসংহার




