ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৫): কুরআনের ভাষার অলৌকিক সৌন্দর্য
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
পর্ব ১-এ আমরা দেখেছি, কুরআন মানবজাতিকে এর মতো একটি সূরা রচনার চ্যালেঞ্জ দিয়েছে, আর কেউ তা পারেনি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কুরআনের ভাষায় এমন কী আছে, যা আরবের শ্রেষ্ঠ কবি-সাহিত্যিকদেরও নির্বাক করে দিয়েছিল? আজ আমরা সেই সৌন্দর্যের কয়েকটি দিক দেখব।
আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি একে আরবি কুরআনরূপে নাযিল করেছি, যাতে তোমরা বুঝতে পারো।" (সূরা ইউসুফ ১২:২)
১. কবিতাও নয়, গদ্যও নয়
আরবদের কাছে ভাষার দুটি রূপ ছিল: ছন্দবদ্ধ কবিতা আর সাধারণ গদ্য। এর বাইরে ছিল গণকদের ছন্দময় মন্ত্র। কুরআন এর কোনোটির ছাঁচে পড়ে না। এতে কবিতার মতো নির্দিষ্ট মাত্রা নেই, অথচ এর প্রবাহে এক অপূর্ব সুর আছে। এতে গদ্যের স্বাধীনতা আছে, অথচ প্রতিটি আয়াতের শেষে এক মাধুর্যময় মিল আছে।
আরবরা যখন কুরআনকে কোনো নাম দিতে চাইল, তারা দ্বিধায় পড়ে গেল। কখনো বলল কবিতা, কখনো যাদু, কখনো গণকের কথা। কুরআন তাদের এই বিভ্রান্তির জবাব দিয়েছে, "এটা কোনো কবির কথা নয়, তোমরা খুব কমই বিশ্বাস করো। এটা কোনো গণকের কথাও নয়, তোমরা খুব কমই উপদেশ গ্রহণ করো।" (সূরা হাক্কাহ ৬৯:৪১-৪২)
২. ধ্বনি যখন ছবি আঁকে
কুরআনের অনেক জায়গায় শব্দের ধ্বনি নিজেই অর্থের ছবি এঁকে দেয়।
সূরা আদিয়াতের শুরু শুনুন: "ওয়াল আদিয়াতি দাবহা, ফাল মূরিয়াতি কাদহা, ফাল মুগীরাতি সুবহা।" অর্থ, শপথ সেই ঘোড়াগুলোর, যারা হাঁপাতে হাঁপাতে ছোটে, তারপর খুরের আঘাতে আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছড়ায়, তারপর ভোরে আক্রমণ করে। (সূরা আদিয়াত ১০০:১-৩) আরবি না জানলেও এর তেলাওয়াত শুনলে মনে হয়, দূর থেকে ঘোড়ার খুরের দ্রুত শব্দ ভেসে আসছে।
আরেক জায়গায় আল্লাহ জিহাদে যেতে অলস লোকদের সম্পর্কে বলেছেন, "ইছছাকালতুম ইলাল আরদ", অর্থাৎ তোমরা মাটির দিকে ভারী হয়ে ঝুঁকে পড়েছ। (সূরা তাওবা ৯:৩৮) "ইছছাকালতুম" শব্দটি উচ্চারণ করতে গিয়েই জিহ্বা ভারী হয়ে আসে। শব্দ নিজেই সেই ভারীত্বের অনুভূতি জাগায়।
৩. প্রতিটি শব্দ নিজের জায়গায়
কুরআনের শব্দচয়ন এত নিখুঁত যে, একটি শব্দ সরিয়ে তার সমার্থক শব্দ বসালেও সৌন্দর্য ও অর্থ দুটোই হারিয়ে যায়। পর্ব ১১-এ আমরা "বাদশাহ" আর "ফেরাউন" শব্দের পার্থক্য দেখেছি। এমন উদাহরণ অসংখ্য।
যেমন, বাতাসের কথা বলতে কুরআন সাধারণত রহমতের প্রসঙ্গে বহুবচন "রিয়াহ" ব্যবহার করেছে, আর শাস্তির প্রসঙ্গে একবচন "রীহ"। মুফাসসিরগণ ব্যাখ্যা করেছেন, রহমতের বাতাস নানা দিক থেকে আসে এবং মেঘ ও বৃষ্টি বয়ে আনে, আর শাস্তির বাতাস একমুখী, ধ্বংসাত্মক। তেমনি বৃষ্টির কথা বলতে কুরআন প্রায়ই রহমতের প্রসঙ্গে "গাইস" আর শাস্তির প্রসঙ্গে "মাতার" শব্দ ব্যবহার করেছে।
৪. অল্প কথায় সাগরসম অর্থ
আরবদের একটি বিখ্যাত প্রবাদ ছিল, "হত্যাই হত্যাকে সবচেয়ে বেশি প্রতিরোধ করে।" তারা একে খুবই সংক্ষিপ্ত ও অর্থবহ মনে করত। কুরআন একই বিষয়ে বলেছে, "কিসাসের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে জীবন।" (সূরা বাকারা ২:১৭৯)
বালাগাত শাস্ত্রের আলেমগণ এই দুটির তুলনা করে দেখিয়েছেন, কুরআনের বাক্যটি শব্দে আরও সংক্ষিপ্ত, অথচ অর্থে অনেক বেশি পূর্ণ। প্রবাদে "হত্যা" শব্দটি দুবার এসেছে, আর তাতে শুধু হত্যার কথা, যা শুনতে নেতিবাচক। কুরআনে এসেছে "জীবন", যা ইতিবাচক। প্রবাদে সব হত্যার কথা, অথচ সব হত্যা হত্যা প্রতিরোধ করে না। কুরআনে বলা হয়েছে "কিসাস", অর্থাৎ ন্যায়সঙ্গত, সমান প্রতিশোধ, যা আসলেই জীবন রক্ষা করে।
৫. একটি আয়াত, শত পৃষ্ঠার ব্যাখ্যা
নূহ (আ.)-এর মহাপ্লাবনের সমাপ্তি বর্ণনা করতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, "বলা হলো, হে জমিন, তোমার পানি গিলে ফেলো, আর হে আকাশ, থেমে যাও। পানি হ্রাস পেল, ফয়সালা সম্পন্ন হলো, নৌকা জুদি পাহাড়ে স্থির হলো, এবং বলা হলো, জালিম সম্প্রদায় দূর হোক।" (সূরা হুদ ১১:৪৪)
একটি মাত্র আয়াতে মহাপ্লাবনের শেষ, পৃথিবীর শান্ত হওয়া, নৌকার থামা আর জালিমদের পরিণতি, সব এসে গেছে। ইমাম সাক্কাকি (রহ.)-এর মতো বালাগাতের ইমামগণ শুধু এই একটি আয়াতের অলংকার বিশ্লেষণে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা লিখেছেন।
৬. শত্রুরাও শুনতে চাইত
কুরআনের ভাষার শক্তির সবচেয়ে বড় সাক্ষী নবীজির শত্রুরাই। সীরাতগ্রন্থে বর্ণিত আছে, কুরাইশের তিন নেতা আবু সুফিয়ান, আবু জাহল ও আখনাস ইবনে শারীক রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে নবীজির ঘরের পাশে গিয়ে তাঁর তেলাওয়াত শুনত। পরপর তিন রাত তারা একে অপরের কাছে ধরা পড়ে, আর প্রতিবার প্রতিজ্ঞা করে, আর আসবে না। (সীরাতে ইবনে হিশাম)
আর প্রকাশ্যে তারা নিজেদের লোকদের বলত, "তোমরা এই কুরআন শুনো না, বরং এর তেলাওয়াতের সময় হট্টগোল করো, যাতে তোমরা জয়ী হতে পারো।" (সূরা হা-মীম সাজদা ৪১:২৬) কোনো দুর্বল বাণী থেকে মানুষকে দূরে রাখতে এত চেষ্টার প্রয়োজন হয় না।
৭. একটি সূরা, একটি হৃদয়
সাহাবি জুবাইর ইবনে মুতইম (রা.) তখনো মুসলমান হননি। বদরের বন্দিদের বিষয়ে কথা বলতে মদিনায় এসেছিলেন। মাগরিবের নামাজে নবীজিকে সূরা তূর তেলাওয়াত করতে শুনলেন। যখন এই আয়াতে পৌঁছলেন, "তারা কি স্রষ্টা ছাড়াই সৃষ্টি হয়েছে, নাকি তারা নিজেরাই স্রষ্টা?" (সূরা তূর ৫২:৩৫), জুবাইর (রা.) বলেন, "আমার মনে হলো, আমার হৃদয় উড়ে যাবে।" (সহিহ বুখারি) তিনি বলেন, সেদিনই ঈমান প্রথম আমার অন্তরে স্থান করে নিয়েছিল।
৮. একটি শাস্ত্রের জন্ম
কুরআনের ভাষার অলৌকিকতা বোঝার জন্যই মুসলিম আলেমগণ আরবি অলংকারশাস্ত্র (ইলমুল বালাগাহ) গড়ে তুলেছেন। আব্দুল কাহির জুরজানি (রহ.) "দালায়িলুল ইজায" গ্রন্থে দেখিয়েছেন, কুরআনের অলৌকিকতা শুধু আলাদা আলাদা শব্দে নয়, বরং শব্দগুলোর বিন্যাস ও গাঁথুনিতে (নাযম)। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে হাজারো আলেম এই সৌন্দর্যের নতুন নতুন দিক আবিষ্কার করেছেন, অথচ তা আজও শেষ হয়নি।
কেন এটি প্রমাণ?
যে মানুষ চল্লিশ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো কবিতা বা ভাষণের জন্য পরিচিত ছিলেন না, যিনি পড়তে-লিখতে জানতেন না, তাঁর মুখে হঠাৎ এমন ভাষা কীভাবে এল, যা ভাষার শ্রেষ্ঠ সমঝদারদের নির্বাক করে দিল, শত্রুদেরও লুকিয়ে শুনতে বাধ্য করল, আর চৌদ্দশ বছর ধরে ভাষাবিদদের গবেষণার বিষয় হয়ে রইল? আর কেন তাঁর নিজের কথা, অর্থাৎ হাদিসের ভাষা, কুরআনের ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা? এর একমাত্র ব্যাখ্যা, এই ভাষা মানুষের নয়।
উপসংহার
কুরআনের সৌন্দর্য শুধু অনুভব করার বিষয় নয়, এটি যাচাই করার বিষয়ও। যিনি আরবি জানেন, তিনি নিজে পড়ে দেখতে পারেন। যিনি জানেন না, তিনি তেলাওয়াত শুনে দেখতে পারেন, কেন অনারব মানুষও অর্থ না বুঝে কুরআন শুনে কাঁদে। এই সৌন্দর্য সেই সত্তার বাণীর চিহ্ন, যিনি ভাষা সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষের হৃদয় সৃষ্টি করেছেন।
আগামী পর্বে থাকছে: কুরআন মুখস্থ করা এত সহজ কেন? ইনশাআল্লাহ।




