ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ২০): পানি থেকে সকল প্রাণ

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

পর্ব ১৯-এ আমরা সূরা আম্বিয়ার ৩০ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশ দেখেছি, যেখানে আসমান ও জমিন মিলিত থাকা ও আলাদা হওয়ার কথা বলা হয়েছে। আজ দেখব একই আয়াতের দ্বিতীয় অংশ।

আল্লাহ তাআলা বলেন, "আর প্রাণবান সবকিছু আমি সৃষ্টি করেছি পানি থেকে। তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" (সূরা আম্বিয়া ২১:৩০)

আরও বলেন, "আল্লাহ প্রত্যেক জীবকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে। তাদের কেউ চলে পেটে ভর দিয়ে, কেউ চলে দুই পায়ে, আর কেউ চলে চার পায়ে। আল্লাহ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন।" (সূরা নূর ২৪:৪৫)

এবং, "তিনিই পানি থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন।" (সূরা ফুরকান ২৫:৫৪)

প্রতিটি কোষের মূল উপাদান

আজকের জীববিজ্ঞান বলে, পৃথিবীর প্রতিটি জীবকোষের সবচেয়ে বড় উপাদান পানি। একটি সাধারণ কোষের প্রায় সত্তর শতাংশই পানি। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দেহের প্রায় ষাট শতাংশ পানি। মস্তিষ্ক ও হৃৎপিণ্ডের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পানি। আর কিছু সামুদ্রিক প্রাণী, যেমন জেলিফিশ, প্রায় পুরোটাই পানি।

শুধু পরিমাণে নয়, কাজেও পানি অপরিহার্য। কোষের ভেতরের প্রায় সব রাসায়নিক বিক্রিয়া ঘটে পানির মাধ্যমে। পানি খাদ্য ও অক্সিজেন বহন করে, বর্জ্য বের করে দেয়, শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। পানি এমন অনেক পদার্থ গলাতে পারে যে, বিজ্ঞানীরা একে বলেন "সর্বজনীন দ্রাবক"। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই জীবনের জটিল রসায়ন সম্ভব হয়েছে।

প্রাণের সূচনা পানিতে

বিজ্ঞানীদের ব্যাপক মত হলো, পৃথিবীতে প্রাণের প্রথম রূপগুলো জন্ম নিয়েছিল পানিতে, প্রাচীন সমুদ্রে। কোটি কোটি বছর ধরে প্রাণ শুধু পানিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

এই বিষয়ে বিজ্ঞানের ব্যাখ্যা সময়ের সাথে বদলাতে পারে, আর আমরা কুরআনকে কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্বের সাথে বেঁধে দিতে চাই না। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট: প্রাণের উৎস ও গঠন, দুই দিক থেকেই আজকের বিজ্ঞান পানিকে প্রাণের মূল উপাদান হিসেবে দেখে।

মহাকাশে প্রাণের খোঁজ

মার্কিন মহাকাশ সংস্থা নাসা মঙ্গলসহ বিভিন্ন গ্রহ ও উপগ্রহে প্রাণের সন্ধানে যে নীতি অনুসরণ করে, তার মূল কথা ছিল: "পানির পিছু নাও।" কারণ বিজ্ঞানীরা জানেন, আমাদের জানা কোনো প্রাণই পানি ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। তাই কোনো গ্রহে প্রাণ থাকতে পারে কি না, তা বুঝতে তাঁরা প্রথমে দেখেন, সেখানে তরল পানি আছে কি না।

দুটি আপত্তি ও তার জবাব

এই প্রমাণ নিয়ে সমালোচকরা দুটি আপত্তি তোলেন। সৎভাবে সেগুলো দেখা দরকার।

প্রথম আপত্তি: কুরআনের বহু আগে, খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে গ্রিক দার্শনিক থেলিস বলেছিলেন, সবকিছুর মূল উপাদান পানি। তাহলে কুরআনের কথায় নতুন কী?

জবাব: থেলিস বলেছিলেন, "সবকিছু" পানি থেকে, পাথর, মাটি, ধাতু, সবকিছু। এটি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু কুরআন বলেছে, "প্রাণবান সবকিছু" (কুল্লা শাইয়িন হাইয়্যিন) পানি থেকে। কুরআন বাক্যটিকে প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে। আর এই সীমানাটুকুই কুরআনের বক্তব্যকে আজকের বিজ্ঞানের সামনে সঠিক রেখেছে, যেখানে থেলিসের বক্তব্য টেকেনি। যদি কুরআন সেই যুগের দর্শন থেকে ধার নিত, তবে স্বাভাবিকভাবেই সেই ভুলটিও সাথে আসত।

দ্বিতীয় আপত্তি: মরুভূমির মানুষ তো জানতই, পানি ছাড়া কেউ বাঁচে না। এ আর এমন কী?

জবাব: পানি ছাড়া বাঁচা যায় না, এটা সবাই জানত, ঠিক। কিন্তু কুরআন বলেনি "পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছি", বলেছে "পানি থেকে সৃষ্টি করেছি"। অর্থাৎ পানি শুধু প্রাণের প্রয়োজন নয়, প্রাণের উপাদান ও উৎস। যে মানুষ জানত না যে দেহ কোষ দিয়ে গঠিত, সে কীভাবে জানবে যে প্রতিটি কোষের মূল উপাদান পানি? আর মরুভূমির উট, যে দিনের পর দিন পানি ছাড়া চলে, কিংবা মরুভূমির শুকনো গুল্ম, এদের দেখে কেউ সহজে ভাবত না যে এরাও মূলত পানি দিয়েই তৈরি।

বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য

সূরা নূরের আয়াতটি আরেকটি সুন্দর দিক তুলে ধরে। আল্লাহ বলেছেন, সব জীব পানি থেকে সৃষ্টি, অথচ কেউ চলে পেটে ভর দিয়ে, কেউ দুই পায়ে, কেউ চার পায়ে। আজ আমরা জানি, সাপ থেকে মানুষ, পিঁপড়া থেকে তিমি, সবার দেহ একই ধরনের কোষ দিয়ে গঠিত, আর সব কোষের ভেতরে একই পানি, একই মৌলিক রসায়ন। বাইরের এত বৈচিত্র্যের পেছনে ভেতরের এই ঐক্য একজন স্রষ্টার দিকেই ইঙ্গিত করে।

কেন এটি প্রমাণ?

এই প্রমাণের শক্তি কোনো চমকপ্রদ দাবিতে নয়, বরং নিখুঁত শব্দচয়নে। কুরআন সপ্তম শতাব্দীর মানুষকে এমন একটি বাক্য বলেছে, যা তাদের কাছে সহজবোধ্য ছিল, আবার একবিংশ শতাব্দীর জীববিজ্ঞানীর কাছেও সঠিক। বাক্যটি এত বড় নয় যে ভুল হওয়ার সুযোগ থাকে, আবার এত সাধারণও নয় যে তা শুধু সাধারণ অভিজ্ঞতার কথা। পূর্ববর্তী দর্শনের যে ভুল ছিল, তা কুরআনে নেই। আর সময় যত গড়িয়েছে, বাক্যটির গভীরতা তত স্পষ্ট হয়েছে।

উপসংহার

আয়াতটির শেষ অংশটি লক্ষ্য করুন: "তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?" আল্লাহ এখানে মানুষকে প্রশ্ন করছেন। যে পানি তুমি প্রতিদিন পান করো, যে পানি তোমার দেহের অধিকাংশ, তার দিকে তাকাও। একই সাধারণ পানি থেকে কীভাবে এত বিচিত্র, এত জটিল, এত সুন্দর প্রাণের সৃষ্টি হলো? এর পেছনে কি একজন জ্ঞানী স্রষ্টা নেই?

আগের পর্ব (পর্ব ১৯): সৃষ্টির সূচনা ও বিস্তৃত মহাবিশ্ব

আগামী পর্বে থাকছে: পাহাড়, পৃথিবীর পেরেক। ইনশাআল্লাহ।