ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৬): কুরআন মুখস্থ করা এত সহজ কেন?
মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
ভূমিকা
পর্ব ২-এ আমরা দেখেছি, কুরআন সংরক্ষিত হয়েছে কাগজে এবং লক্ষ লক্ষ হাফেজের বুকে। আজকের প্রশ্ন একটু ভিন্ন: এত বড় একটি গ্রন্থ এত মানুষ মুখস্থ করতে পারছে কীভাবে? আর এই সহজতা নিজেই কীভাবে কুরআনের সত্যতার প্রমাণ?
একটি ঘোষণা, চারবার
সূরা কামারে আল্লাহ তাআলা একটি আয়াত চারবার বলেছেন, "আমি কুরআনকে উপদেশ গ্রহণের জন্য সহজ করে দিয়েছি। অতএব আছে কি কেউ উপদেশ গ্রহণকারী?" (সূরা কামার ৫৪:১৭, ২২, ৩২, ৪০)
আরবি "যিকর" শব্দের অর্থ যেমন উপদেশ, তেমনি স্মরণ ও মুখস্থ রাখাও। মুফাসসিরগণ বলেছেন, আল্লাহ কুরআনের শব্দ মুখস্থ করা এবং এর অর্থ বোঝা, দুটোই সহজ করে দিয়েছেন।
একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ নবীজিকে বলেছেন, "আমি তোমার প্রতি এমন এক কিতাব নাযিল করেছি, যা পানি ধুয়ে মুছে ফেলতে পারবে না। তুমি তা পড়বে ঘুমন্ত ও জাগ্রত অবস্থায়।" (সহিহ মুসলিম) কাগজের লেখা পানিতে মুছে যায়, কিন্তু যা বুকে গাঁথা থাকে, তা কোনো পানি মুছতে পারে না।
কারা মুখস্থ করছে?
কুরআনে আছে ১১৪টি সূরা, ছয় হাজারেরও বেশি আয়াত, সাতাত্তর হাজারেরও বেশি শব্দ। এত বড় গ্রন্থ যারা প্রথম অক্ষর থেকে শেষ অক্ষর পর্যন্ত মুখস্থ করছে, তাদের দিকে তাকান:
১. শিশু। অনেক শিশু দশ বছর বয়সের আগেই পুরো কুরআনের হাফেজ হয়ে যায়। এই বয়সে তারা নিজের মাতৃভাষার একটি ছোট বইও মুখস্থ বলতে পারে না।
২. অনারব মানুষ। বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, আফ্রিকা, পৃথিবীর হাফেজদের বড় অংশই আরবি ভাষাভাষী নন। অনেকে অর্থ না বুঝেই প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি হরকত নির্ভুলভাবে মুখস্থ রাখেন।
৩. দৃষ্টিহীন মানুষ। অসংখ্য অন্ধ হাফেজ আছেন, যাঁরা কখনো মুসহাফের একটি পাতাও দেখেননি, শুধু শুনে শুনে পুরো কুরআন বুকে ধারণ করেছেন।
৪. বৃদ্ধ মানুষ। অনেকে ষাট-সত্তর বছর বয়সে মুখস্থ শুরু করে হাফেজ হয়েছেন, যে বয়সে মানুষ নতুন কিছু মনে রাখতে হিমশিম খায়।
৫. সাধারণ মানুষ। হাফেজ হওয়ার জন্য কোনো বিশেষ বংশ, শ্রেণি বা পেশা লাগে না। কৃষকের ছেলে, দিনমজুরের মেয়ে, সবার জন্য দরজা খোলা।
অন্য ঐতিহ্যের সাথে তুলনা
ন্যায্যতার খাতিরে বলা দরকার, পৃথিবীর কোনো কোনো প্রাচীন ধর্মীয় ঐতিহ্যেও মুখস্থের প্রচলন আছে। কিন্তু সেগুলোতে সাধারণত একটি বিশেষ পুরোহিত শ্রেণি বহু বছরের কঠোর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তা ধরে রাখে, আর সাধারণ মানুষ এর বাইরে থাকে। কুরআনের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে মুখস্থ করছে সাধারণ মানুষের সন্তান, পৃথিবীর প্রতিটি মহাদেশে, প্রতিটি ভাষাগোষ্ঠীতে, এবং তাদের সংখ্যা কোটির ঘরে।
আর মুখস্থের বাইরেও প্রায় প্রত্যেক মুসলমান কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ রাখেন, কারণ নামাজে তা পড়তে হয়। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে পৃথিবীর কোটি মানুষ কুরআন পড়ছে স্মৃতি থেকে।
যে বৈশিষ্ট্যগুলো মুখস্থকে সহজ করে
১. ছন্দ ও সুর। পর্ব ১৫-এ আমরা দেখেছি, কুরআনের আয়াতগুলোর শেষে এক মাধুর্যময় মিল আছে, আর এর প্রবাহে আছে সুর। এই ছন্দ স্মৃতিতে গেঁথে যায়।
২. তেলাওয়াতের নিয়ম। তাজবিদের নিয়ম শব্দের উচ্চারণকে এমনভাবে বেঁধে দিয়েছে যে, ভুল হলে কানেই তা ধরা পড়ে।
৩. পুনরাবৃত্তি ও বৈচিত্র্য। কুরআনে কিছু বিষয় বারবার এসেছে, যা মনে রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু প্রতিবার এসেছে একটু ভিন্ন শব্দে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে।
মজার বিষয় হলো, এই শেষ বৈশিষ্ট্যটিই হাফেজদের জন্য সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। কাছাকাছি শব্দের আয়াতগুলো (মুতাশাবিহাত) গুলিয়ে ফেলা খুব সহজ। তবুও লক্ষ লক্ষ হাফেজ এই সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো নির্ভুলভাবে মনে রাখেন। এটা প্রমাণ করে, এই সহজতা শুধু কৌশলের ফল নয়।
প্রতি বছরের জীবন্ত পরীক্ষা
প্রতি রমজানে পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মসজিদে তারাবির নামাজে হাফেজরা স্মৃতি থেকে পুরো কুরআন তেলাওয়াত করেন। পেছনে থাকেন আরও হাফেজ, যাঁরা একটি হরকতের ভুলও ধরিয়ে দেন। এভাবে প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে কুরআনের এক বিশাল জীবন্ত মিলিয়ে দেখা হয়। আর প্রতি বছর ঢাকা থেকে সিউল, কায়রো থেকে লন্ডন, সবখানে একই কুরআন শোনা যায়।
সহজ, কিন্তু অবহেলার নয়
নবীজি (সা.) সতর্ক করেছেন, "কুরআনের প্রতি যত্নবান থাকো। যাঁর হাতে মুহাম্মদের প্রাণ, তাঁর কসম, রশিতে বাঁধা উট যেমন ছুটে যায়, কুরআন তার চেয়েও দ্রুত (বুক থেকে) ছুটে যায়।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
অর্থাৎ কুরআন মুখস্থ করা সহজ, কিন্তু ধরে রাখতে নিয়মিত তেলাওয়াত লাগে। আর এই নিয়মিত তেলাওয়াতই মুসলিম জীবনের অংশ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে নামাজের মাধ্যমে। সহজতা আর সংরক্ষণের ব্যবস্থা, দুটোই একসাথে।
কেন এটি প্রমাণ?
একজন মানুষ লেখক কি নিশ্চিত করতে পারেন যে, তাঁর বই চৌদ্দশ বছর ধরে পৃথিবীর সব ভাষার মানুষ, শিশু থেকে বৃদ্ধ, অন্ধ থেকে অনারব, মুখস্থ করতে পারবে? এমন দাবি করাই দুঃসাহস। অথচ কুরআন এই দাবি করেছে, তাও এক সূরায় চারবার, আর চৌদ্দশ বছরের ইতিহাস সেই দাবিকে সত্য প্রমাণ করেছে। এই সহজতা একটি জীবন্ত মুজিযা, যা আজও যে কেউ যেকোনো হিফযখানায় গিয়ে নিজের চোখে দেখতে পারেন।
উপসংহার
যে কিতাবকে আল্লাহ সহজ করে দিয়েছেন, তা লক্ষ লক্ষ শিশুর কণ্ঠে প্রতিদিন উচ্চারিত হচ্ছে। এই দৃশ্য নিজেই সাক্ষ্য দেয়, কুরআন সেই আল্লাহর বাণী, যিনি মানুষের স্মৃতি সৃষ্টি করেছেন এবং নিজের বাণীকে সেই স্মৃতিতে গেঁথে দিয়েছেন।
আগের পর্ব (পর্ব ১৫): কুরআনের ভাষার অলৌকিক সৌন্দর্য
আগামী পর্বে থাকছে: কুরআন শুনে বদলে যাওয়া হৃদয়। ইনশাআল্লাহ।




