ইসলাম সত্য হবার ১০০ প্রমাণ (পর্ব ১৮): মাতৃগর্ভে মানব সৃষ্টির ধাপ

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান

ভূমিকা

আজ থেকে আমরা এমন কিছু প্রমাণ দেখব, যেখানে কুরআন সৃষ্টিজগতের কোনো বিষয়ে কথা বলেছে। শুরুতে একটি কথা পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার। কুরআন বিজ্ঞানের পাঠ্যবই নয়, এটি হেদায়েতের কিতাব। কুরআন সৃষ্টির কথা বলে আল্লাহর কুদরত চেনানোর জন্য, আর মৃত্যুর পর পুনরুত্থানের যুক্তি দেওয়ার জন্য। তাই আমরা কোনো আয়াতকে টেনে বিজ্ঞানের সাথে মেলানোর চেষ্টা করব না। আমরা শুধু আয়াতের শব্দ আর আধুনিক বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তথ্য পাশাপাশি রাখব। বিচার করবেন পাঠক নিজে।

আয়াতটি

আল্লাহ তাআলা বলেন, "আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির নির্যাস থেকে। তারপর তাকে নুতফা (শুক্রবিন্দু) রূপে স্থাপন করেছি এক সংরক্ষিত আধারে। তারপর নুতফাকে পরিণত করেছি আলাকায়, তারপর আলাকাকে পরিণত করেছি মুদগায় (চিবানো মাংসপিণ্ড), তারপর মুদগাকে পরিণত করেছি হাড়ে, তারপর হাড়কে ঢেকে দিয়েছি মাংস দিয়ে। তারপর তাকে গড়ে তুলেছি এক ভিন্ন সৃষ্টিরূপে। অতএব আল্লাহ বরকতময়, সর্বোত্তম স্রষ্টা।" (সূরা মুমিনুন ২৩:১২-১৪)

এবার প্রতিটি শব্দ দেখা যাক।

১. নুতফা: সামান্য ফোঁটা

আরবি "নুতফা" অর্থ অল্প পানি, এক ফোঁটা। আজ আমরা জানি, একজন মানুষের সৃষ্টি শুরু হয় শুক্রাণু ও ডিম্বাণুর মিলনে, যা পরিমাণে খুবই সামান্য। বীর্যের লক্ষ লক্ষ শুক্রাণুর মধ্যে মাত্র একটি ডিম্বাণুর সাথে মিলিত হয়। কুরআন আরও বলেছে, "তার কি সেই বীর্যের এক ফোঁটা ছিল না, যা স্খলিত হয়?" (সূরা কিয়ামাহ ৭৫:৩৭) অর্থাৎ পুরো বীর্য নয়, তার একটি অংশ।

২. নুতফা আমশাজ: মিশ্রিত ফোঁটা

আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন, "আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্রিত শুক্রবিন্দু থেকে।" (সূরা দাহর ৭৬:২) নবীজি (সা.)-ও বলেছেন, সন্তান সৃষ্টি হয় পুরুষ ও নারী উভয়ের পানি থেকে। (সহিহ মুসলিম)

এর গুরুত্ব বুঝতে হলে সেই যুগের ধারণা জানতে হবে। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের মতো অনেকে মনে করতেন, সন্তান তৈরি হয় পুরুষের বীজ থেকে, আর নারী শুধু জমাট বাঁধা ঋতুস্রাবের রক্ত দিয়ে তার কাঠামো জোগান দেয়। এ বিষয়ে নানা মত ছিল, আর এর অনেকগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে ছিল। আজ আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, সন্তানের বংশগত উপাদানের অর্ধেক আসে পিতা থেকে, অর্ধেক মাতা থেকে। কুরআনের "মিশ্রিত ফোঁটা" এই সত্যের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

৩. কারারিন মাকিন: সংরক্ষিত আধার

নুতফাকে রাখা হয়েছে "এক সংরক্ষিত, সুদৃঢ় আধারে"। জরায়ু মায়ের দেহের গভীরে, পেলভিসের হাড় দিয়ে ঘেরা, শক্ত পেশির দেয়ালে সুরক্ষিত। ভ্রূণ সেখানে নিরাপদে বেড়ে ওঠে।

৪. আলাকা: ঝুলে থাকা, জোঁকসদৃশ

এই শব্দটিই সবচেয়ে বিস্ময়কর। আরবি "আলাকা" শব্দের তিনটি অর্থ: যা কোনো কিছুর সাথে লেগে বা ঝুলে থাকে; জোঁক; আর জমাট রক্ত। পুরনো মুফাসসিরগণ প্রধানত শেষ অর্থটি নিয়েছেন।

আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান বলে, নিষেকের প্রায় এক সপ্তাহ পর ভ্রূণ জরায়ুর দেয়ালে গেঁথে যায় এবং সেখানে লেগে থেকে বাড়তে থাকে। তৃতীয়-চতুর্থ সপ্তাহের দিকে ভ্রূণের আকৃতি অনেকটা জোঁকের মতো দেখায়, আর জোঁক যেমন অন্যের রক্ত থেকে পুষ্টি নেয়, ভ্রূণও তেমনি মায়ের রক্ত থেকে পুষ্টি নেয়। এ সময় এতে রক্ত জমাট বাঁধার মতো চেহারাও থাকে, কারণ রক্তনালি তৈরি হচ্ছে কিন্তু রক্ত সঞ্চালন তখনো পূর্ণভাবে শুরু হয়নি।

একটি শব্দে তিনটি অর্থ, আর তিনটিই এই পর্যায়ের ভ্রূণের সাথে মেলে। অথচ এ সময় ভ্রূণের আকার মাত্র কয়েক মিলিমিটার, খালি চোখে এর আকৃতি বোঝার কোনো উপায় ছিল না।

৫. মুদগা: চিবানো মাংসপিণ্ড

"মুদগা" অর্থ এক টুকরো মাংস, যা চিবানো হয়েছে। প্রায় চতুর্থ সপ্তাহে ভ্রূণের পিঠ বরাবর ছোট ছোট উঁচু খণ্ড তৈরি হয় (সোমাইট), যা থেকে পরে মেরুদণ্ড, পেশি ও ত্বক গড়ে ওঠে। এই খণ্ডগুলোর কারণে ভ্রূণকে দেখতে লাগে যেন কেউ কামড়ে দিয়েছে, যেন দাঁতের দাগ।

অন্য আয়াতে কুরআন বলেছে, "মুদগা, আকৃতিপ্রাপ্ত ও অনাকৃতিপ্রাপ্ত।" (সূরা হজ ২২:৫) এ পর্যায়ে ভ্রূণের কিছু অঙ্গ গঠিত হতে শুরু করেছে, আর কিছু তখনো অগঠিত।

৬. হাড়, তারপর মাংসের আবরণ

এরপর কুরআন বলছে, মুদগা থেকে হাড় তৈরি হলো, তারপর হাড়কে মাংস দিয়ে ঢেকে দেওয়া হলো। ভ্রূণবিজ্ঞান দেখায়, ষষ্ঠ-সপ্তম সপ্তাহের দিকে কঙ্কালের কাঠামো (প্রথমে তরুণাস্থি রূপে) তৈরি হয়, আর পেশিগুলো এই কাঠামোর চারপাশে বিন্যস্ত হয়ে তাকে আবৃত করে। "ঢেকে দেওয়া" (কাসাওনা) শব্দটি ঠিক এই চিত্রই তুলে ধরে, যেন কাপড় দিয়ে কোনো কিছু মুড়িয়ে দেওয়া।

নবীজি (সা.) বলেছেন, "নুতফার ওপর যখন বিয়াল্লিশ রাত অতিবাহিত হয়, আল্লাহ একজন ফেরেশতা পাঠান, তিনি তার আকৃতি দেন এবং তার কান, চোখ, চামড়া, মাংস ও হাড় তৈরি করেন।" (সহিহ মুসলিম) বিয়াল্লিশ দিন, অর্থাৎ ষষ্ঠ সপ্তাহের শুরু। ভ্রূণবিজ্ঞান অনুযায়ী ঠিক এ সময়েই ভ্রূণে মানুষের চেহারার বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট হতে শুরু করে।

৭. এক ভিন্ন সৃষ্টি

সবশেষে আল্লাহ বলেন, "তারপর তাকে গড়ে তুলেছি এক ভিন্ন সৃষ্টিরূপে।" অষ্টম সপ্তাহের পর ভ্রূণকে আর "এমব্রায়ো" বলা হয় না, বলা হয় "ফিটাস"। এ সময় থেকে মূলত নতুন কোনো অঙ্গ তৈরি হয় না, বরং তৈরি অঙ্গগুলো বড় হয় ও পূর্ণতা পায়। ভ্রূণ এখন স্পষ্টভাবে একটি মানবশিশুর রূপ নিয়েছে। আগের পর্যায়গুলো থেকে এটি সত্যিই এক "ভিন্ন সৃষ্টি"।

শব্দের সূক্ষ্মতা: "সুম্মা" আর "ফা"

আয়াতে লক্ষ্য করার মতো একটি বিষয় আছে। নুতফা থেকে আলাকায় রূপান্তরের কথা বলতে "সুম্মা" (তারপর, কিছু সময় পর) শব্দটি এসেছে। আর আলাকা থেকে মুদগা, মুদগা থেকে হাড়, হাড় থেকে মাংসের আবরণ, এগুলোর মাঝে এসেছে "ফা" (তারপরই, দ্রুত)। আরবি ব্যাকরণে "সুম্মা" বোঝায় বিলম্ব, আর "ফা" বোঝায় দ্রুত ধারাবাহিকতা। ভ্রূণবিজ্ঞানেও দেখা যায়, নিষেক থেকে জরায়ুতে গেঁথে যাওয়া পর্যন্ত কিছুটা সময় লাগে, কিন্তু এর পরের পর্যায়গুলো খুব দ্রুত, কয়েক সপ্তাহের মধ্যে, একের পর এক ঘটে যায়।

তিন অন্ধকারে

আল্লাহ আরও বলেন, "তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভে সৃষ্টি করেন, এক সৃষ্টির পর আরেক সৃষ্টি, তিন অন্ধকারে।" (সূরা যুমার ৩৯:৬) সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.)-সহ মুফাসসিরগণ এই তিন অন্ধকারের ব্যাখ্যা করেছেন পেট, জরায়ু আর গর্ভফুল বা ভ্রূণের আবরণ দিয়ে। আজকের শারীরবিদ্যাও দেখায়, ভ্রূণ মায়ের পেটের দেয়াল, জরায়ুর দেয়াল আর ভ্রূণের নিজস্ব আবরণী পর্দা, এই তিন স্তরের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে।

কেন এটি প্রমাণ?

প্রথম অণুবীক্ষণ যন্ত্র তৈরি হয় সপ্তদশ শতাব্দীতে। ১৬৭৭ সালে মানুষ প্রথম শুক্রাণু দেখতে পায়। আর ভ্রূণের ধাপগুলোর বিস্তারিত বিবরণ জানা গেছে মূলত বিংশ শতাব্দীতে। সপ্তম শতাব্দীর আরবের এক নিরক্ষর মানুষের পক্ষে কোনোভাবেই জানা সম্ভব ছিল না, কয়েক মিলিমিটারের একটি ভ্রূণ দেখতে কেমন, বা কোন ধাপের পর কোন ধাপ আসে।

আরও লক্ষণীয় হলো, কুরআন সেই যুগের প্রচলিত ভুল ধারণাগুলোর কোনোটি গ্রহণ করেনি। যদি কুরআন মানুষের রচনা হতো, তবে স্বাভাবিকভাবেই তাতে সমকালীন চিকিৎসাবিদ্যার কিছু ভুল ঢুকে পড়ত, যেমন ঢুকেছে সেই যুগের অন্যান্য গ্রন্থে। অথচ কুরআনের সহজ শব্দগুলো চৌদ্দশ বছর পরেও ভ্রূণবিজ্ঞানের সামনে অটল দাঁড়িয়ে আছে।

উপসংহার

কুরআন এই বর্ণনা দিয়েছে শুধু জ্ঞান দেওয়ার জন্য নয়, বরং মানুষকে নিজের দিকে তাকাতে বলার জন্য। আল্লাহ বলেন, "হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থান নিয়ে সন্দেহে থাকো, তবে ভেবে দেখো, আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি মাটি থেকে, তারপর নুতফা থেকে, তারপর আলাকা থেকে, তারপর মুদগা থেকে..." (সূরা হজ ২২:৫) যিনি এক ফোঁটা পানি থেকে এমন বিস্ময়কর মানুষ গড়ে তুলেছেন, তাঁর পক্ষে মৃত্যুর পর আবার জীবিত করা কঠিন কিছু নয়। অতএব আল্লাহ বরকতময়, সর্বোত্তম স্রষ্টা।

আগের পর্ব (পর্ব ১৭): কুরআন শুনে বদলে যাওয়া হৃদয়

লিংক

https://dawah24.com/bn/news/100-proofs-that-islam-is-true-part-17-hearts-transformed-by-hearing-the-quran

আগামী পর্বে থাকছে: সৃষ্টির সূচনা ও বিস্তৃত মহাবিশ্ব। ইনশাআল্লাহ।