মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান
জীবনের ১৭টি বছর মাদরাসার ছাত্র ছিলাম। এরপর ১৬ বছর শিক্ষকতা করেছি। এই দীর্ঘ সময়ে এমন জঘন্য ঘটনা কখনো চোখে দেখিনি। আমার ওস্তাদরা ছিলেন তাকওয়ার মূর্ত প্রতীক। ছাত্রদের তাঁরা সন্তানের মতো ভালোবাসতেন, আমানত হিসেবে আগলে রাখতেন। কিন্তু কিছুদিন ধরে কিছু ভুঁইফোঁড় প্রতিষ্ঠান থেকে এমন সব খবর আসছে, যা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু হয়ে যায়, বুক কেঁপে ওঠে।
টুপি-দাড়ি-জুব্বা থাকলেই কেউ হুজুর হয়ে যায় না। হুজুর তো সে, যার অন্তরে আল্লাহর ভয় আছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,
إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ
"আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।" (সূরা ফাতির, ২৮)
যার অন্তরে আল্লাহর ভয় নেই, সে যত বড় পাগড়িই পরুক, সে আলেম নয়। যে কোমলমতি শিশুর আমানত খেয়ানত করে, সে ওয়ারিসে নবী নয়, সে দ্বীনের শত্রু। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْئُولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ
"তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল, আর প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।" (সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম)
যে শিক্ষক তার ছাত্রের সাথে অন্যায় করে, সে শুধু একটি শিশুর জীবন নষ্ট করে না। সে হাজারো মানুষের মনে দ্বীন আর আলেমদের প্রতি ঘৃণা ঢুকিয়ে দেয়। এই অপরাধ দ্বিগুণ, ব্যক্তির বিরুদ্ধে এবং দ্বীনের বিরুদ্ধে।
তাই স্পষ্ট করে বলতে চাই:
এক. এসব অপরাধীকে আড়াল করা যাবে না। "আলেমদের সম্মান রক্ষা" বা "মাদরাসার বদনাম হবে" এই অজুহাতে কাউকে বাঁচানোর চেষ্টা নিজেই বড় অন্যায়। আলেমদের সম্মান রক্ষা হয় অপরাধীকে শাস্তি দিলে, লুকালে নয়। দেশের আইন অনুযায়ী তাদের সর্বোচ্চ বিচার হোক।
দুই. ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়াতে হবে। তাদের কথা প্রাথমিকভাবে বিশ্বাস করতে হবে, সাহস দিতে হবে, প্রয়োজনে আইনি সহায়তা নিতে হবে। মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানো ঈমানের দাবি।
তিন. অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। সন্তানকে যেকোনো জায়গায় ভর্তি করার আগে প্রতিষ্ঠানের পরিচয়, পরিচালনা, শিক্ষকদের যোগ্যতা যাচাই করুন। সন্তানের সাথে নিয়মিত কথা বলুন, যাতে কোনো কষ্টের কথা সে নির্ভয়ে আপনাকে বলতে পারে।
চার. মাদরাসা বোর্ড ও দায়িত্বশীলদের প্রতি অনুরোধ, অনুমোদনহীন ও নিয়ন্ত্রণহীন প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে কঠোর হোন। শিক্ষক নিয়োগে চরিত্র যাচাই আর ছাত্রদের সুরক্ষার সুস্পষ্ট নিয়ম চালু করুন।
পাঁচ. আর যারা এই ঘটনাগুলো দেখিয়ে সব আলেম আর সব মাদরাসাকে একসাথে দোষারোপ করছেন, তাদের প্রতিও বিনীত অনুরোধ। হাজারো মাদরাসায় লাখো আলেম নিঃস্বার্থভাবে দ্বীনের খেদমত করে যাচ্ছেন। কয়েকজন অপরাধীর দায় তাঁদের ঘাড়ে চাপানো ইনসাফ নয়। ডাক্তারের লেবাসে কেউ অপরাধ করলে আমরা চিকিৎসাশাস্ত্রকে দোষ দিই না, অপরাধীকেই দিই।
হুজুর শব্দটা আমাদের কাছে সম্মানের, ভালোবাসার, আস্থার। এই শব্দটাকে যারা কলঙ্কিত করছে, তাদের বিরুদ্ধে সবার আগে আমাদের, আলেমদেরই সোচ্চার হতে হবে।
আল্লাহ আমাদের সন্তানদের হেফাজত করুন, প্রকৃত আলেমদের মর্যাদা রক্ষা করুন, আর লেবাসধারী এই অপরাধীদের হাত থেকে দ্বীন ও উম্মাহকে রক্ষা করুন।




