হুজুর মানে কী?

হুজুর শব্দের মূল আরবি "হুদূর" (حُضُور), যার অর্থ উপস্থিতি। এর ধাতু ح ض ر, যা থেকে এসেছে হাজির, হাজরাত, মাহজার ইত্যাদি শব্দ। তবে আরবি হলেও সম্বোধন হিসেবে এর ব্যবহার গড়ে উঠেছে ফার্সি ও উর্দুতে। মুঘল দরবারে সম্মানিত ব্যক্তিকে সরাসরি নাম ধরে না ডেকে "আপনার উপস্থিতি" অর্থে হুজুর বলা হতো, অনেকটা ইংরেজির Your Highness বা Your Honour-এর মতো। রাজা, নবাব, বিচারক, পরে জমিদার ও ইংরেজ সাহেবদেরও এভাবে ডাকা হতো। "জি হুজুর" কথাটা সেই যুগেরই স্মৃতি। বাংলায় জনাব যে অর্থে, হুজুরও মূলত সেই অর্থে।

কয়েকশ বছর আগে ধর্মগুরু ও ধর্মশিক্ষকদের সম্মান দিয়ে, নাম না ধরে, একটি লকব হিসেবে এই শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। ধীরে ধীরে এটি আলেম, ইমাম ও মাদরাসার শিক্ষকদের পরিচয় হয়ে ওঠে। আমাদের প্রিয় নবীজিকেও এদেশের মানুষ পরম ভালোবাসায় ডাকে "হুজুর পাক সা."।

ধর্মগুরু ও ইমামদের আমল-আখলাক, নীতি-নৈতিকতা সাধারণ মানুষের মন জয় করে। যার ফলে বহু মানুষ হুজুর না হয়েও হুজুরের লেবাস পরতে শুরু করেন। একসময় সমাজে আসল হুজুরদের চেয়ে পোশাকি হুজুরের সংখ্যাই বেড়ে যায়। এখন দাড়ি-টুপি দেখলেই আমাদের সমাজে হুজুর মনে করা হয়। অথচ হুজুর শব্দটি ব্যবহৃত হতো গভীর ধর্মীয় জ্ঞান ও উন্নত চরিত্রের উৎকৃষ্ট মানুষদের জন্য।

যাই হোক, শব্দটির অপব্যবহারের কারণে গত কিছু বছর ধরে শাইখ, উস্তাদ ও আল্লামা শব্দের প্রচলন বেড়েছে। আমি একজন দাঈ। অনেকেই আমাকে শাইখ ডাকেন, অনেকে উস্তাদ, কেউ মুফতি, মাওলানা বা মুহাদ্দিস বলেন। মজার ব্যাপার হলো, আরবরা আলেমদের হুজুর বলেন না। তারা বলেন শাইখ বা উস্তাজ, সম্মান করে বলেন সাইয়্যিদি, বড় আলেমদের বলেন সামাহাতুশ শাইখ। তবে একই ধাতু থেকে "হাদরাতুকুম" (حضرتكم) আরবিতেও সম্মানসূচক সম্বোধন হিসেবে চলে।

অনেকে হুজুর বা মোল্লাকে খাটো করে দেখেন। এমনকি অনেক হুজুরও এটিকে নিজের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। হুজুর এখন তাবলিগওয়ালা, সাধারণ দ্বীনদার শ্রেণি বা মক্তবের শিক্ষকের লকব হয়ে গেছে। একটু ইলমওয়ালা হলেই তাকে হুজুরের চেয়ে উঁচু স্তরের কোনো লকব খুঁজতে হয়। এই মানুষগুলো হুজুর শব্দের মর্মটাই বোঝেননি। সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশে হুজুর শব্দটি বিকৃত হয়ে গেছে।

তবু আমি একজন হুজুর। আলহামদুলিল্লাহ।

হুজুর জাতের সদস্য হতে পেরে আমার মনে কোনো গ্লানি নেই, বরং আল্লাহর এই নিয়ামতের জন্য শুকরিয়া আদায় করি। হুজুর মানে দ্বীনের দাঈ। হুজুর হওয়া মানে ইসলামের ওপর চলতে সদা সচেষ্ট একজন মানুষ, যে নিজেকে শুদ্ধ করতে চায়, নিজের আশপাশ ও বিশ্বকে বদলে দিতে চায়, হুজুর পাক সা.-এর আদর্শে রাঙাতে চায় চরাচর। পশ্চিমের প্রভাব থেকে যে মুক্ত।

হে আল্লাহ, আমাদের সত্যিকারের হুজুর হওয়ার তাওফিক দাও। আমিন।

মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান